০৮:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণহীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর: গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফ্যাসিস্ট দোসর

  • প্রকাশিত ০২:৪৪:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
  • ২৭ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার জন্য মাদক একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকের জালে আটকা পড়ছে। অথচ এই ভয়াল মাদকবিরোধী লড়াইয়ের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান — মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) — গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে। বরং এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে রেখেছে একদল ফ্যাসিস্ট দোসর ও সিন্ডিকেট, যারা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা – দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকৃত নেতৃত্ব বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। সিন্ডিকেটের চাপে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

রাজনৈতিক প্রভাব – গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য কিন্তু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ লোকজন বসানো হয়েছে। ফলে পেশাদার অফিসাররা উপেক্ষিত হচ্ছেন।

সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড – মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে অভিযান, মামলা, এমনকি পুনর্বাসন কর্মসূচিও প্রভাবিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে এবং বড় মাদক ব্যবসায়ীরা রক্ষা পাচ্ছে, কিন্তু ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা সাধারণ আসক্তরা গ্রেপ্তার হচ্ছে।

মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি: ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের বাজার গত এক দশকে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে।

তরুণ প্রজন্ম বিপর্যস্ত: বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মাদকের কবলে পড়ছে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে: মাদক ব্যবসার সাথে চোরাচালান, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি: মাদকের কারণে কর্মক্ষম জনশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণা (সূত্র: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ২০২২) দেখিয়েছে যে মাদকাসক্তির হার বিগত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে। অপরদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি দমন না করলে আইন প্রয়োগের যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনেওয়াজ বলেন:

“মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে যদি প্রশাসনিক সংস্কার না আনা হয় এবং সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা না হয়, তবে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ মাদক-নির্ভর একটি ‘সফট স্টেট’-এ পরিণত হতে পারে।”

সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া – প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ নিতে হবে।

পেশাদার অফিসার নিয়োগ – যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা – মাদক নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা শক্তি বৃদ্ধি – আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালাইসিস ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ – শুধু গ্রেপ্তার নয়, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গত ১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের অনেকে ফ্যাসিস্ট দোসর ও সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত। এর ফলে বাংলাদেশে মাদক সমস্যা শুধু একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য এক মহা-বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

যদি অবিলম্বে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে মাদক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার জন্যও ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

Tag :
জনপ্রিয়

৩৬ টি শীর্ষ শুন্য পদ এখন ও খালি এলজিইডি তে স্থবিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণহীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর: গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফ্যাসিস্ট দোসর

প্রকাশিত ০২:৪৪:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার জন্য মাদক একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকের জালে আটকা পড়ছে। অথচ এই ভয়াল মাদকবিরোধী লড়াইয়ের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান — মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) — গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে। বরং এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে রেখেছে একদল ফ্যাসিস্ট দোসর ও সিন্ডিকেট, যারা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা – দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকৃত নেতৃত্ব বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। সিন্ডিকেটের চাপে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

রাজনৈতিক প্রভাব – গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য কিন্তু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ লোকজন বসানো হয়েছে। ফলে পেশাদার অফিসাররা উপেক্ষিত হচ্ছেন।

সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড – মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে অভিযান, মামলা, এমনকি পুনর্বাসন কর্মসূচিও প্রভাবিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে এবং বড় মাদক ব্যবসায়ীরা রক্ষা পাচ্ছে, কিন্তু ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা সাধারণ আসক্তরা গ্রেপ্তার হচ্ছে।

মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি: ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের বাজার গত এক দশকে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে।

তরুণ প্রজন্ম বিপর্যস্ত: বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মাদকের কবলে পড়ছে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে: মাদক ব্যবসার সাথে চোরাচালান, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি: মাদকের কারণে কর্মক্ষম জনশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণা (সূত্র: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ২০২২) দেখিয়েছে যে মাদকাসক্তির হার বিগত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে। অপরদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি দমন না করলে আইন প্রয়োগের যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনেওয়াজ বলেন:

“মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে যদি প্রশাসনিক সংস্কার না আনা হয় এবং সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা না হয়, তবে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ মাদক-নির্ভর একটি ‘সফট স্টেট’-এ পরিণত হতে পারে।”

সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া – প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ নিতে হবে।

পেশাদার অফিসার নিয়োগ – যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা – মাদক নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা শক্তি বৃদ্ধি – আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালাইসিস ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ – শুধু গ্রেপ্তার নয়, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গত ১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের অনেকে ফ্যাসিস্ট দোসর ও সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত। এর ফলে বাংলাদেশে মাদক সমস্যা শুধু একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য এক মহা-বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

যদি অবিলম্বে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে মাদক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার জন্যও ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।