জনগণের দ্বারা যে রাজনীতি গঠিত হয় আর সেই রাজনীতির নেতৃত্বে যখন ছাত্ররা চলে আসে তখনই একটি সমাজ পরিবর্তন হতে বেশি দেরী লাগেনা।
হয়তো উপরোক্ত এই চিন্তাধারার সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপট কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ তা নিয়ে আমরা অনেকেই সন্দিহান।
যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম ও ‘গেস্টরুম সংস্কৃতির’ ইতি টানতে হয়েছে। বর্তমানে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি কেমন হবে, এর ব্যাপ্তি কতটা থাকবে!
শেষ বারের মত যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হয়েছিল তখন সময়টা ছিল ২০১৯ সাল। এক অসুস্থ রাজনীতির চর্চা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে রেখেছিল, সে সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। তবে জুলাই বিপ্লবের এক বছর পেরোতেই আবারও ছাত্র সংসদগুলো জেগে উঠছে বলে আমি খুবই আনন্দিত ও আশাবাদী।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের সব কয়টি শিক্ষাঙ্গন দখল করেছিল ছাত্রলীগ। তাদের আধিপত্য বিস্তার এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনেকটা ক্রীতদাসের মতো আচরণ করেছে।
ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ধারণ করে সেই লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি হলগুলোতে এখনও বহাল রয়েছে। বিভিন্ন আদর্শের নামে কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হলগুলো দখল করে রেখেছে। তবে আমি মনে করি আসন্ন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রসমাজ অনেক বেশি অবলম্বন করছে। আর তাইতো এবারের ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ছড়াছড়ি।
দেখা যাচ্ছে, ছাত্রসমাজ সবসময় রাজনীতির নামে সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আত্মত্যাগী নেতাদের খুঁজে নেবে। রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে লড়েছে এমন প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে আমার ধারণা।
এদিকে চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা। আসন্ন ডাকসু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নির্বাচনি আমেজ বইছে। সর্বাধিক সংখ্যক প্রার্থীও অংশ নিচ্ছে এবারের নির্বাচনে।
মোট ১০ প্যানেল ও একাধিক স্বতন্ত্র পদপ্রার্থী মিলে এবারের নির্বাচনে লড়বেন ৪৬২ জন।
প্যানেলগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদল, বাম জোটের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল, ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট, বাগছাসের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল, জামাল উদ্দিন খালিদের ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল,উমামার ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল, জুবায়ের-মোসাদ্দেকদের প্যানেল, অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেল।
যদিও ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘উদাসীনতার’ অভিযোগ তুলেছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা। উমামা ফাতেমা বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তারা তা নিচ্ছে না। প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতার ফলে নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুদায়িত্ব। ছাত্রলীগবিহীন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আনন্দঘন পরিবেশ শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে এটাই আশা করছি।
তবে যারা ঠিক মতো পড়াশোনা না করে বছরের পর বছর ক্যাম্পাসে পড়ে থাকে শুধু রাজনীতি করার জন্য — তাদেরকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকাই উচিত। যারা নিজের জীবনের ভবিষ্যৎ সাজাতে পারে না, তারা অন্য কারো ভবিষ্যৎ গড়ার কাজেও নেতৃত্ব দিতে পারবে না।
একই প্যানেলের সবাইকে ভোট না দিয়ে প্রত্যেক পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া উচিৎ। যে প্রার্থীর পড়াশোনা ভালো, আচার-ব্যবহার মার্জিত, সুন্দর করে কথা বলতে পারে, কথায় ও কাজে সততা বজায় রাখে, নেতৃত্বের গুণ আছে — সেই ধরনের প্রার্থীই ভোট পাওয়ার যোগ্য।
এদিকে প্রস্তাব উঠেছে ডাকসুর সব প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট (Dope test) করানোর জন্য, এটা গুড প্রপোজাল। যারা ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত নেতৃত্ব দিবে তারা যেন আবার মাদকাসক্ত না হয়, এটা নিশ্চিত করবে।
যারা নিয়মিত মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন তাদের শরীরে ওই নেশাজাতীয় পদার্থের কিছুটা হলেও থেকে যায়। আর সেটিই ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ধরা পড়ে। কোনো ব্যক্তি আদৌ মাদকাসক্ত কি না তা যাচাইয়ের জন্য যে মেডিকেল পরীক্ষা করা হয় তাকেই ডোপ টেস্ট বলে।
তবে যেই ছাত্র রাজনীতি নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে, সেটা কি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসলেই এত গুরুত্বপূর্ণ? চলুন জেনে নেয়া যাক ইতিহাস কি বলে।
বিশ্বজুড়ে ছাত্র রাজনীতি বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান, যা রাজনৈতিক দল গঠন, সরকারবিরোধী আন্দোলন, বা সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই অঞ্চলে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি ছাত্রদের রাজনীতি‑মুক্ত, ন্যায়‑ভিত্তিক আন্দোলনই বাঁধন সৃষ্টি করেছিল, যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হয়।
এরপর ৬‑দফা আন্দোলন, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সশস্ত্র ছাত্র গণঅভ্যুত্থান—যেখানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (SAC) গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে—এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক দাবিগুলো শক্তিশালী হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্ররা গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতায় ব্যাপক অবদান রাখে। অনেক ছাত্র শহীদ হয় এই সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে।
১৯৯০ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরাচারবিরোধী এবং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে; এর ফলেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন।
অপরদিকে ১৯৮২-৮৩ সালে মজিদ খান শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন ছিল একটি ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন। এই আন্দোলনে সামরিক সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ সাম্প্রদায়িকীকরণের অভিযোগে গড়ে ওঠে। ড. আবদুল মজিদ খান কর্তৃক প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ জনগণ বৃহৎ আকারে প্রতিবাদ জানায়। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন সাধারণ মানুষ নিহত হন। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সরকার শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারায় এ ঘটনাকে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।
২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা হ্রাস ও নিস্প্রভ করার দাবি নিয়ে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন হয়। সেই প্রভাবে কোটা কমানো হয়।ফেব্রুয়ারী ২০১৮-তে শুরু হওয়া এই আন্দোলন “কোটা সংস্কার” দাবির পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়েও সংগঠিত হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছাত্রদের ভূমিকা
ছাত্ররা মহামূল্যবান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৯০‑এর স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—সবসময় তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক শিক্ষা, নেতৃত্ব, সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দৃঢ়তা অর্জন করে; যা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গঠনে সহায়ক।
ছাত্ররা জাতির মূল্যবোধ, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে নাগরিক সমাজকে প্রতিবাদী করে তোলে।
যদিও অনেক ছাত্র সংগঠন—বিশেষ করে রাজনীতিক দলগুলোর ছাত্র শাখা—নিয়ন্ত্রণমূলক, অপরাধ, দুর্নীতি ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে। এরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে । এর ফলে শিক্ষার সময় স্থগিত, মেধাবী ছাত্রদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বিপুল সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয় ।
বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি শুরু থেকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য ভূমিকা রেখে এসেছে। তবে বর্তমান সময়ে এটি রাজনৈতিক দলীয় হিংসা ও অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তবে সঠিক সংস্কার ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব গড়ে উঠলে আবারও ছাত্র রাজনীতি গণতন্ত্র ও সমাজ পরিবর্তনের বাহক হয়ে উঠতে পারে।
সর্বোপরি বলা যায় রাষ্ট্রের পতন হয় যখন রাষ্ট্র থেকে সুবিচার উঠে যায়। আর এই সুবিচার বজায় রাখতে ছাত্র রাজনীতি থাকা জরুরী। কারণ পরবর্তীতে এরাই যুবসমাজ রূপে দেশের হাল ধরবে এবং সমাজে সুবিচার নিশ্চিত করবে।