১২:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শান্তা মারিয়া :

সাংবাদিক হবেন অথচ ধান্দাবাজি করবেন না, তা কি হয়?

  • প্রকাশিত ১২:১৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫
  • ২৩ বার দেখা হয়েছে

আপনি কি সাংবাদিক? মানে সাংবাদিকতা পেশায় আছেন? পত্রিকায় অথবা টিভি চ্যানেলে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন? কিন্তু আপনি কি ক্ষমতার দালালি, পল্টিবাজি , ঘুষ নেয়া, রিপোর্ট চাপা দেয়া অথবা রিপোর্টের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা, প্লট, পদ পদবী, পুরস্কার এসবের লোভে নিজের আত্মাকে বিক্রি করতে পারছেন? আপনি যদি পুরুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনার পত্রিকা অথবা চ্যানেল মালিকের চাহিদা অনুযায়ী নারী সরবরাহ করতে পারছেন? আপনি নিজে নারী হয়ে থাকলে যেখানে সেখানে শুয়ে পড়া রপ্ত করতে পেরেছেন? হাওয়া বুঝে কিবোর্ড ও কলমের গতি নির্ধারণ করতে পারেন? ভিনদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় নিজের দেশের স্বার্থ চুলোয় দিয়ে ঝোল টেনে লিখতে পারেন? পাবলিক খায় এমন উদ্ভট, রগরগে ও বানোয়াট, যৌনগন্ধী নিউজ তৈরি করতে পারেন? ঝোঁপ বুঝে কোপ মারতে পারেন? স্বৈরাচারের আমলে প্রেস কনফারেন্সে গিয়ে তেলবাজি, গণহত্যায় উসকানি দিতে পেরেছিলেন? আর এখন বর্তমান সরকারের আমলে পল্টি খেয়ে নতুন সরকারের পক্ষে গলাবাজি করতে পারছেন?

এসব যদি না পেরে থাকেন তাহলে মরতে সাংবাদিকতায় এসেছিলেন কেন?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের খোলা চিঠি পড়ে এসব কথাই মনে হলো। যারা লেখাটি পড়েননি তাদের সেই লেখাটি পড়ার অনুরোধ জানাই। সেখানে তিনি নিজের বিষয়ে যে কথাগুলো লিখেছেন তা এক মর্মান্তিক দলিল। একটি অংশ তুলে ধরছি।

তিনি লিখেছেন, ‘ শেখ হাসিনার শাসনামলে নানা পরিচয়ে অনেকে অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। একপর্যায়ে লাজলজ্জা ভুলে আমিও শেখ হাসিনার দরবারে সাহায্যের আবেদন করে কোনো ফল পাইনি। অনেক সাংবাদিক প্লট পেয়েছেন। আমি দুই বার আবেদন করেও সফল হইনি। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও নাকি কতজন ভাগ্য বদলেছেন। অথচ আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত দুটি বইয়ের জন্য আমি দুই টাকাও রয়্যালিটি পাইনি। একেই বলে কপাল! তবে হ্যাঁ, একবার শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ওই সফরের জন্য কিছু হাত খরচের টাকা আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো ওই কোটপ্যান্টজুতো কিনতেই শুধু শেষ হয়, আরও দেনা হয়েছে। ওই সুবাদে আমার কোট-টাই জুতা কেনা! সারাজীবন তো স্যান্ডেল পরেই কাটল।শুধু মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অবিচল অবস্থানের কারণে আমাকে আজও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দেওয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী আমলেও কোনো বাস্তব পুরস্কার পাইনি। আমি পেলাম না একটি প্লট, না একটি ভালো চাকরি। বরং দীর্ঘ সময় চাকরিহীন থেকে ঋণের বোঝা বেড়েছে। স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে পরিবারের দায়বদ্ধতা আমাকে প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে রাখে।’

কি ভয়াবহ উপলব্ধি। একজন প্রবীণ সাংবাদিকের কি করুণ দশা। বিভুরঞ্জনের সঙ্গে আমি কখনও কোন পত্রিকায় সহকর্মী ছিলাম না। তবে অনেক অনুষ্ঠানে তাকে দেখেছি। পরিচয় ছিল, আলাপও ছিল। কখনও তাকে ধান্দাবাজ বলে মনে হয়নি। ধান্দাবাজ যে ছিলেন না সেটা তো তার শেষ লেখাতেই বোঝা যাচ্ছে।

আমার নিজের সাংবাদিকতার বয়স প্রায় ত্রিশ বছর।
পৈতৃক সম্পত্তি, পারিবারিক উচ্চ অবস্থান, কপালজোর এবং অদম্য মনোবল না থাকলে আমার আর্থিক অবস্থাও বিভুদার মতোই হতো। গেল পনেরো বছরে দেখেছি, আমার অধীনে সাংবাদিকতা শুরু করা কত জন শূন্য থেকে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছে। মিডিয়া মালিককে নারী সরবরাহ করে রাতারাতি বেসুমার টাকার মালিক হয়েছে। বিদেশে টাকা পাচার করে অনেক অর্থ বিত্তেরও মালিক হয়েছে। অমুক মন্ত্রী, তমুক নেতার বান্ধবী হয়ে বিশাল বিশাল পদ, পদবী, পুরস্কার, প্লট, বাড়ি, গাড়ি সবই বাগিয়েছে।

জনকণ্ঠে চাকরি করেছি দশ বছর। পাঁচ মাস ধরে বেতন বাকি থাকায় আন্দোলন করেছিলাম। সেই আন্দোলনের কারণে ঈদের আগে একটি টাকা না দিয়ে আমাদের অনেক জনের চাকরি খাওয়া হয়। জনকণ্ঠের কাছে আমার এখনও দশ লাখ টাকা পাওনা। আঠার বছর পার হয়েছে।
অনেক পত্রিকাতেই কয়েক দফা বেতন বন্ধ হতে দেখলাম। নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় অনেক সাংবাদিকের চরম আর্থিক সংকটও দেখেছি। সেসময় আওয়ামী-বিরোধী অনেক সাংবাদিকের চাকরি চলে যেতেও দেখেছি।

আবার জুলাই বিপ্লবের এক বছরের মধ্যে অনেককে পল্টি খেতেও দেখলাম। যারা বিএনপির নাম শুনতে পারতেন না , জামাত শুনলে অকথ্য ভাষায় কথা বলতেন, তারাই এখন বিএনপি ও জামাতপন্থী সাংবাদিক সেজে বড় বড় কথা বলছেন।

বিভুদা আওয়ামী রাজনীতিকে সমর্থন করতেন। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে তিনি মোজাম্মেল বাবু, সন্তোষ শর্মা , শ্যামল দত্ত, মুন্নী সাহা, নইম নিজামদের মতো র এর এজেন্ট কিংবা স্বৈরাচারের অত বড় দালাল হতে পারেননি। সে জন্য প্লট, গাড়ি, বাড়ি কিছুই পাননি। তিনি বুঝতে পারেননি শুধু আওয়ামি রাজনীতিকে সমর্থন করলেই চলবে না, পাশাপাশি অনেক বড় দালাল এবং র এর এজেন্টও হতে হবে।

অথচ, সাংবাদিকতা পেশা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ পেশা, সত্য তুলে ধরার পেশা। সাংবাদিকের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, সমর্থন থাকতেই পারে। কিন্তু সেজন্য নির্লজ্জ দালালি করতে হবে কেন? গত পনেরো বছরে আমরা বেহায়াপনা এবং লাজ শরমের মাথা খেয়ে স্বৈরাচারের যে গুনকীর্তন সাংবাদিকদের মুখে শুনেছি এখন আবার তার উল্টো চিত্র দেখছি। নিজেদের ভোল পাল্টে মিডিয়াগুলো এখন উল্টো গাওনা গাইছে।
আরে দালালরা, জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ কর। যে সময় স্বৈরাচারী হাসিনার নির্দেশে নিরস্ত্র ছাত্র জনতার বুকে গুলি চালানো হচ্ছিল সেসময় তোরা সেই খবর প্রকাশ করতে পারিসনি। তোরা তখনও স্বৈরাচারের দালালি করছিলি। এখন আবার তোরা একই কায়দায় বর্তমান সরকারের দালালি করছিস।

বিভুরঞ্জনের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতামতের পার্থক্য ছিল এ কথা সত্যি। কিন্তু তার শেষ লেখায় তিনি যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো তো নির্মম বাস্তব চিত্র। সাংবাদিকতা পেশাটিই আজকাল ধান্দাবাজদের পেশায় পরিণত হয়েছে। আগে যেমন বিএনপি ট্যাগ দেয়া হয়েছিল তেমনি এখন আওয়ামি ট্যাগ লাগানো হচ্ছে অনেক সাংবাদিককে।

দরকার হলো একজন মানুষের সত্যিকারভাবে লেখার ক্ষমতা আছে কিনা, রিপোর্টিং পারেন কিনা, কলাম লিখতে পারেন কিনা সেটা বিবেচনা করা। ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। এখনও যদি ট্যাগ লাগানো চলতে থাকে তাহলে তো সেই স্বৈরাচারী মনোভাবই বজায় রইল।
সাংবাদিকতা পেশাটিকে সংস্কার করা দরকার। দালাল মুক্ত করা দরকার। সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। মিডিয়া মালিকরা যেন নিজেদের স্বার্থে সাংবাদিক না পোষে, তাদের দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বেশ্যাবৃত্তি না করাতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি মিডিয়ায় যেন ঠিকভাবে বেতনভাতা দেয়া হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কিভাবে ? সে বিষয়ে আমার কিছু চিন্তা ভাবনা আছে। সেগুলো আগামি লেখা লিখবো। বিভুরঞ্জনের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। এই লেখাটি লেখার সময়ই জানতে পারলাম তাঁর মরদেহ পাওয়া গেছে মেঘনা নদীতে। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আর যেন কোন প্রবীণ সাংবাদিকের এমন পরিণতি না হয়।

Tag :
জনপ্রিয়

বাহারছড়ায় ঈদে মিলাদুন্নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপলক্ষে জুলুস অনুষ্ঠিত

শান্তা মারিয়া :

সাংবাদিক হবেন অথচ ধান্দাবাজি করবেন না, তা কি হয়?

প্রকাশিত ১২:১৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫

আপনি কি সাংবাদিক? মানে সাংবাদিকতা পেশায় আছেন? পত্রিকায় অথবা টিভি চ্যানেলে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন? কিন্তু আপনি কি ক্ষমতার দালালি, পল্টিবাজি , ঘুষ নেয়া, রিপোর্ট চাপা দেয়া অথবা রিপোর্টের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা, প্লট, পদ পদবী, পুরস্কার এসবের লোভে নিজের আত্মাকে বিক্রি করতে পারছেন? আপনি যদি পুরুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনার পত্রিকা অথবা চ্যানেল মালিকের চাহিদা অনুযায়ী নারী সরবরাহ করতে পারছেন? আপনি নিজে নারী হয়ে থাকলে যেখানে সেখানে শুয়ে পড়া রপ্ত করতে পেরেছেন? হাওয়া বুঝে কিবোর্ড ও কলমের গতি নির্ধারণ করতে পারেন? ভিনদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় নিজের দেশের স্বার্থ চুলোয় দিয়ে ঝোল টেনে লিখতে পারেন? পাবলিক খায় এমন উদ্ভট, রগরগে ও বানোয়াট, যৌনগন্ধী নিউজ তৈরি করতে পারেন? ঝোঁপ বুঝে কোপ মারতে পারেন? স্বৈরাচারের আমলে প্রেস কনফারেন্সে গিয়ে তেলবাজি, গণহত্যায় উসকানি দিতে পেরেছিলেন? আর এখন বর্তমান সরকারের আমলে পল্টি খেয়ে নতুন সরকারের পক্ষে গলাবাজি করতে পারছেন?

এসব যদি না পেরে থাকেন তাহলে মরতে সাংবাদিকতায় এসেছিলেন কেন?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের খোলা চিঠি পড়ে এসব কথাই মনে হলো। যারা লেখাটি পড়েননি তাদের সেই লেখাটি পড়ার অনুরোধ জানাই। সেখানে তিনি নিজের বিষয়ে যে কথাগুলো লিখেছেন তা এক মর্মান্তিক দলিল। একটি অংশ তুলে ধরছি।

তিনি লিখেছেন, ‘ শেখ হাসিনার শাসনামলে নানা পরিচয়ে অনেকে অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। একপর্যায়ে লাজলজ্জা ভুলে আমিও শেখ হাসিনার দরবারে সাহায্যের আবেদন করে কোনো ফল পাইনি। অনেক সাংবাদিক প্লট পেয়েছেন। আমি দুই বার আবেদন করেও সফল হইনি। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও নাকি কতজন ভাগ্য বদলেছেন। অথচ আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত দুটি বইয়ের জন্য আমি দুই টাকাও রয়্যালিটি পাইনি। একেই বলে কপাল! তবে হ্যাঁ, একবার শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ওই সফরের জন্য কিছু হাত খরচের টাকা আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো ওই কোটপ্যান্টজুতো কিনতেই শুধু শেষ হয়, আরও দেনা হয়েছে। ওই সুবাদে আমার কোট-টাই জুতা কেনা! সারাজীবন তো স্যান্ডেল পরেই কাটল।শুধু মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অবিচল অবস্থানের কারণে আমাকে আজও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দেওয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী আমলেও কোনো বাস্তব পুরস্কার পাইনি। আমি পেলাম না একটি প্লট, না একটি ভালো চাকরি। বরং দীর্ঘ সময় চাকরিহীন থেকে ঋণের বোঝা বেড়েছে। স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে পরিবারের দায়বদ্ধতা আমাকে প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে রাখে।’

কি ভয়াবহ উপলব্ধি। একজন প্রবীণ সাংবাদিকের কি করুণ দশা। বিভুরঞ্জনের সঙ্গে আমি কখনও কোন পত্রিকায় সহকর্মী ছিলাম না। তবে অনেক অনুষ্ঠানে তাকে দেখেছি। পরিচয় ছিল, আলাপও ছিল। কখনও তাকে ধান্দাবাজ বলে মনে হয়নি। ধান্দাবাজ যে ছিলেন না সেটা তো তার শেষ লেখাতেই বোঝা যাচ্ছে।

আমার নিজের সাংবাদিকতার বয়স প্রায় ত্রিশ বছর।
পৈতৃক সম্পত্তি, পারিবারিক উচ্চ অবস্থান, কপালজোর এবং অদম্য মনোবল না থাকলে আমার আর্থিক অবস্থাও বিভুদার মতোই হতো। গেল পনেরো বছরে দেখেছি, আমার অধীনে সাংবাদিকতা শুরু করা কত জন শূন্য থেকে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছে। মিডিয়া মালিককে নারী সরবরাহ করে রাতারাতি বেসুমার টাকার মালিক হয়েছে। বিদেশে টাকা পাচার করে অনেক অর্থ বিত্তেরও মালিক হয়েছে। অমুক মন্ত্রী, তমুক নেতার বান্ধবী হয়ে বিশাল বিশাল পদ, পদবী, পুরস্কার, প্লট, বাড়ি, গাড়ি সবই বাগিয়েছে।

জনকণ্ঠে চাকরি করেছি দশ বছর। পাঁচ মাস ধরে বেতন বাকি থাকায় আন্দোলন করেছিলাম। সেই আন্দোলনের কারণে ঈদের আগে একটি টাকা না দিয়ে আমাদের অনেক জনের চাকরি খাওয়া হয়। জনকণ্ঠের কাছে আমার এখনও দশ লাখ টাকা পাওনা। আঠার বছর পার হয়েছে।
অনেক পত্রিকাতেই কয়েক দফা বেতন বন্ধ হতে দেখলাম। নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় অনেক সাংবাদিকের চরম আর্থিক সংকটও দেখেছি। সেসময় আওয়ামী-বিরোধী অনেক সাংবাদিকের চাকরি চলে যেতেও দেখেছি।

আবার জুলাই বিপ্লবের এক বছরের মধ্যে অনেককে পল্টি খেতেও দেখলাম। যারা বিএনপির নাম শুনতে পারতেন না , জামাত শুনলে অকথ্য ভাষায় কথা বলতেন, তারাই এখন বিএনপি ও জামাতপন্থী সাংবাদিক সেজে বড় বড় কথা বলছেন।

বিভুদা আওয়ামী রাজনীতিকে সমর্থন করতেন। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে তিনি মোজাম্মেল বাবু, সন্তোষ শর্মা , শ্যামল দত্ত, মুন্নী সাহা, নইম নিজামদের মতো র এর এজেন্ট কিংবা স্বৈরাচারের অত বড় দালাল হতে পারেননি। সে জন্য প্লট, গাড়ি, বাড়ি কিছুই পাননি। তিনি বুঝতে পারেননি শুধু আওয়ামি রাজনীতিকে সমর্থন করলেই চলবে না, পাশাপাশি অনেক বড় দালাল এবং র এর এজেন্টও হতে হবে।

অথচ, সাংবাদিকতা পেশা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ পেশা, সত্য তুলে ধরার পেশা। সাংবাদিকের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, সমর্থন থাকতেই পারে। কিন্তু সেজন্য নির্লজ্জ দালালি করতে হবে কেন? গত পনেরো বছরে আমরা বেহায়াপনা এবং লাজ শরমের মাথা খেয়ে স্বৈরাচারের যে গুনকীর্তন সাংবাদিকদের মুখে শুনেছি এখন আবার তার উল্টো চিত্র দেখছি। নিজেদের ভোল পাল্টে মিডিয়াগুলো এখন উল্টো গাওনা গাইছে।
আরে দালালরা, জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ কর। যে সময় স্বৈরাচারী হাসিনার নির্দেশে নিরস্ত্র ছাত্র জনতার বুকে গুলি চালানো হচ্ছিল সেসময় তোরা সেই খবর প্রকাশ করতে পারিসনি। তোরা তখনও স্বৈরাচারের দালালি করছিলি। এখন আবার তোরা একই কায়দায় বর্তমান সরকারের দালালি করছিস।

বিভুরঞ্জনের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতামতের পার্থক্য ছিল এ কথা সত্যি। কিন্তু তার শেষ লেখায় তিনি যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো তো নির্মম বাস্তব চিত্র। সাংবাদিকতা পেশাটিই আজকাল ধান্দাবাজদের পেশায় পরিণত হয়েছে। আগে যেমন বিএনপি ট্যাগ দেয়া হয়েছিল তেমনি এখন আওয়ামি ট্যাগ লাগানো হচ্ছে অনেক সাংবাদিককে।

দরকার হলো একজন মানুষের সত্যিকারভাবে লেখার ক্ষমতা আছে কিনা, রিপোর্টিং পারেন কিনা, কলাম লিখতে পারেন কিনা সেটা বিবেচনা করা। ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। এখনও যদি ট্যাগ লাগানো চলতে থাকে তাহলে তো সেই স্বৈরাচারী মনোভাবই বজায় রইল।
সাংবাদিকতা পেশাটিকে সংস্কার করা দরকার। দালাল মুক্ত করা দরকার। সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। মিডিয়া মালিকরা যেন নিজেদের স্বার্থে সাংবাদিক না পোষে, তাদের দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বেশ্যাবৃত্তি না করাতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি মিডিয়ায় যেন ঠিকভাবে বেতনভাতা দেয়া হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কিভাবে ? সে বিষয়ে আমার কিছু চিন্তা ভাবনা আছে। সেগুলো আগামি লেখা লিখবো। বিভুরঞ্জনের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। এই লেখাটি লেখার সময়ই জানতে পারলাম তাঁর মরদেহ পাওয়া গেছে মেঘনা নদীতে। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আর যেন কোন প্রবীণ সাংবাদিকের এমন পরিণতি না হয়।