গত কিছুদিন যাবৎ সোশাল মিডিয়ায় বেশ কিছু সংবাদ এবং ছবি দেখছি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হচ্ছে।বিভিন্নভাবে তারা লাঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।এটা ভীষণ দুঃখজনক। অনেকেই আমাকে এটা প্রশ্ন করেছেন একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি বিষয়টাকে কিভাবে দেখছেন?তাই আমি আমার ভাবনা থেকে কিছু বিষয় বলার চেষ্টা করছি যেটা একান্তই আমার নিজস্ব মতামত।
আমাদের যে প্রজন্মটাকে আমরা Gen Z বলছি তাদের বড় একটা অংশ বেড়ে উঠেছে কিংবা উঠছে জীবনের চরম বিভৎস কিছু ছবি দেখে।তারা দেখেছে অভিভাবকদের চরমভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত হতে যখন তারা নাগরিক অধিকারের কথা বলে।এমনকি গুম,খুনের শিকার হতেও তারা দেখেছে।তারা দিনে দুপুরে একদল মানুষ বিশ্বজিৎকে কুপিঁয়ে মেরে ফেলতে দেখেছে।তারা দেখেছে আবরার ফাহাদের মতো একজন মেধাবীকে কিভাবে মেরে ফেলা হয়।তারা দেখেছে কিভাবে একজন মুসল্লীকে পেটানো হয়।তারা দেখেছে সংখ্যালঘুদের জমি কিভাবে দখল করা হয়েছে।তারা দেখেছে তাদের প্রতিষ্ঠানে কিভাবে একজন শিক্ষক তার মতো করে স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন,কিভাবে বছরের পর বছর বিভিন্ন রকম অন্যায়ের সাথে জড়িত ছিলেন।তারা দেখেছে কিভাবে তাদের অভিভাবকেরা নাগরিকের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত।তারা এটাও দেখেছে অন্যায় দেখে কিভাবে চোখ এবং মুখ বন্ধ করে রাখতে হয় জীবনের ভয়ে।যদিও এই অন্যায়কে তারা সঠিকভাবে বলতে পারেনা এটা অন্যায় হচ্ছে কিন্তু তারা তো বুঝতে পারে এটা অন্যায়।আর এধরনের ঘটনাগুলো শিশুদের মানসপটে বড় একটি প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি।এই প্রজন্ম দেখেছে তাদের পিতা কিংবা পিতৃসম কেউ এত এত মন্দ কাজ করছে অথচ তাদের কোন শাস্তি নেই।তারা দেখেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে এমন কিছু মানুষ বসে আছেন যারা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে।শিক্ষার সাথে নূণ্যতম সম্পর্ক না থাকার পরেও তারা শিক্ষা ব্যবস্হায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকে।তারা দেখেছে শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে কিভাবে মার্কস কমিয়ে দেওয়া হয়।ফেইল করিয়ে দেওয়া হয়।এসব শিক্ষক অল্প কিছুদিনের মাঝেই লাখপতি,কোটিপতি হয়ে যায় সেটাও তারা দেখেছে।এই প্রজন্মের আগে আমরা যারা মিলেনিয়ালসরা তারা কিন্তু বইয়ে নৈতিক এবং ধর্মীয় অনেক শিক্ষা পেয়েছি।আমাদের পারিবারিক শিক্ষাগুলোও অনেক শক্তিশালী জায়গায় ছিলো।কিন্তু আমাদের GenZকে আমরা পরিপূর্ণভাবে সেই শিক্ষাটুকু দিতে পেরেছি কিনা এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।আর তাই তারা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার,প্রতিবাদ করার সুযোগটা পেয়েছে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে।তবে এখানে একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে এই কাজগুলো যারা করছে তারা একটা অংশ মাত্র। তারা জানেনা অন্যায়কে কিভাবে ন্যায়ের পথে থেকে রুখে দেয়া যায়।তারা জানেনা সবকিছুর একটা সুন্দর পথ আছে।যারা অন্যায় করেছে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনার সঠিক পথটা তাদের জানা নেই।এখানে অবশ্যই অভিভাবক এবং শিক্ষকদের বড় একটি ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি। আর সবচেয়ে বড় যে ভূমিকা সেটা হলো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রে যদি ন্যায় বিচার,সুন্দর একটা শিক্ষাব্যবস্হা,নাগরিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা যায় অবশ্যই আমাদের এই প্রজন্ম আমাদের গর্বিত করবে এটা আমার বিশ্বাস।আমি অন্যায়কে প্রশ্রয় নয় বরং এই বাচ্চাগুলোকে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করার পক্ষপাতী।তাদেরকে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যটাতো আমাদেরকেই বোঝাতে হবে।এরা যদি হেরে যায় তবে আমরা কি হেরে যাবোনা? আমরা কি কেবল তাদেরকে তোমরা ভুল করছো,তোমাদের কোন ভবিষ্যৎ নাই,ধ্বংস হয়ে যাবে তোমরা, এসব বলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করবো নাকি আমরা সবাই তাদেরকে ভুল শুদ্ধের তফাৎ নির্ণয়ে সাহায্য করবো এটা আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে বলে আমি মনে করি।
আমরা এখানে আরো একটি দল দেখছি যারা অন্যায় হলে প্রতিবাদ করছে,এক ভাইয়ের পাশে আরেক ভাই নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, বন্যার্ত মানুষকে সাহায্য করতে তারা ছুটে যাচ্ছে, কেউ কেউ মারাও গেছে।টিএসসিতে কি শৃঙ্খলার সাথে তারা ত্রান কার্যক্রম পরিচালনা করছে,ছোট ছোট বাচ্চারা মাটির ব্যাংক,সালামির টাকা নিয়ে হাজির হচ্ছে মানুষের জন্য।বন্যার পানি নেমে যেতেই একদল ছাত্র নেমে গেছে রাস্তা সংস্কারের কাজে।আমরা এই সুন্দর দৃশ্যগুলোও দেখছি বাংলাদেশজুড়ে।তাই আমরা কেবল এই নেতিবাচক দিকগুলো ফোকাস করে হা হুতাশ না করে সবাই মিলে সুন্দর একটা রাষ্ট্র বিনির্মানে কাজ করা উচিৎ। ছোট ছোট টিএজাররা যারা আসলে কিছু ভুল করছে তাদেরকে আমরাই পথ দেখাতে পারি।
পরিশেষে এতটুকুই বলতে চাই আমাদের সন্তানদের আমরা অনেক ভালোবাসি।আর সেই ভালোবাসাটুকু দিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথটা দেখাতে পারবো।এত বছরে যা কিছু হয়েছে তার সবটুকু একদিনে ঠিক হয়তো আমরা করতে পারবোনা,কিন্তু আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা একদিন জয়ী হবোই ইনশাআল্লাহ।। সবার জন্য শুভকামনা।।