বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ” আমাদের শিক্ষার মধ্যে এমন একটা সম্পদ থাকা চাই যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না সত্য দেয়, যা কেবল ইন্ধন দেয় না অগ্নি দেয়।” সারা পৃথিবীতে মানুষ জ্ঞানের সন্ধানে ছুটে চলেছে, আমরাও তাদের ব্যতিক্রম নয়। ভৌগোলিকভাবে হোক বা সামাজিকভাবেই হোক বাংলাদেশ জ্ঞানচর্চায় যথেষ্ট এগিয়ে এসেছে বলা যায় কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা-বর্তমান হুমকির মুখে পড়েছে যার থেকে উত্তরণ বিশেষ প্রয়োজন। সংক্ষেপে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই-
জীবন গঠনে পারিবারিক শিক্ষা ঃ
মানুষের জীবনে নীতি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ,শিষ্টাচার সংযত আচরণ, ভদ্রতা ,নম্রতা ,সহনশীলতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সর্বোপরি উন্নত মানসিকতাবোধ এসব কিছুই একজন তার পরিবার থেকেই প্রাথমিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। দার্শনিক টমাস কার্লাইল বলেছেন, ভদ্র আচরণ করতে বইয়ের শিক্ষা লাগে না তবে ভদ্র আচরণ করতে পারিবারিক শিক্ষাই যথেষ্ট। বর্তমান সমাজে পরিবারের দায়িত্ববোধ কমে যাওয়া এবং পরিবারের গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে যার ফলে বাবা-মা, ভাই বোন সকলেই যেন তাদের রক্তের বন্ধনকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে না। আমরা যখন ছোটবেলায় আমাদের মুরুব্বিদের কাছ থেকে কথা শুনতাম যে ,একটা পরিবার আদর্শ হলে সে পরিবারের সন্তানও আদর্শ হবে। পরিবার আসলে একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে মায়া- মমতা, ভালবাসার বন্ধন থাকে। আর একটা পরিবারকেই জ্ঞান চর্চার সূতিকাগার বলা হয় কারণ প্রাথমিক জ্ঞান চর্চা হয় পরিবার থেকে পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য একজন শিক্ষনীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠে, ছোট্ট একটি শিশুর কাছে সে আস্তে আস্তে যখন বড় হয় তখন সে পারিবারিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে সামনের দিকে এগিয়ে যায় ,সে বুঝতে পারে যে সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে তার বেশি কষ্ট হবে না কারণ পরিবার তাকে শিখিয়েছে কিভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হবে । অবশ্যই এক্ষেত্রে আমাদের সামনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ, আমাদের গুরুজন এবং আমাদের আত্মীয় স্বজন। অনেকে মনে করেন একাডেমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা লাভ করে শিক্ষিত হওয়া যায় বটে কিন্তু পরিবার থেকে সুশিক্ষা না পেলে সেই জ্ঞানের কিন্তু পূর্ণতা আসে না । ঠিক তেমনি আমরা যখন একটা মানুষকে শিক্ষিত বলি তখন অবশ্যই তার গুনাগুন আমরা পর্যালোচনা করি তাকে হয়তো অনুসরণ করি তার মূল্যবোধ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে তখনই আমরা তাকে শিক্ষিত বলি। আজকে যে সন্তানটি স্কুল বা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের যায়, বন্ধুদের সাথে মিশে সে যথেষ্ট সমবেদনশীল হয়ে ওঠে কারণ তার আশেপাশে পরিবেশ থেকে নিজেকে চিনতে পারে ,বুঝতে পারে। আমরা যথেষ্ট বড় হয়ে এ জিনিসটি বুঝতে সক্ষম হয়েছি যে শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র হচ্ছে তার পরিবার । সে তার জীবনকে সামনের দিকে পরিচালিত করতে পারবে যদি সে পরিবার থেকে সঠিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে অথবা পরিবার যদি থাকে সত্যিকার ভাবে প্রাথমিক শিক্ষাটুকু দিতে পারে , তাহলেই তার ভবিষ্যৎ আরো অনেক বেশি সহজ এবং সুন্দর হবে। শহরের বর্তমান অবস্থা দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে যে একটা পরিবারের বাবা -মা উভয়ই কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো সন্তানও বাবা-মার নিকট থেকে যথেষ্ট সান্নিধ্য বা একটা সন্তানের যা প্রাপ্য তা সবসময়ই পায় না। যার কারণে সন্তানদের মস্তিষ্ক ধারন বা সৃষ্টিশীল কাজে যথেষ্ট অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে পারে না। আমরা অনেকেই জানি, যে সন্তান তার ভাই বোনের সাথে বা তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে শেয়ার করতে শেখেনা ,সে নিজের অজান্তেই স্বার্থপর বা আদর্শহীন মানুষে পরিণত হয়।
পারিবারিক শিক্ষার প্রকারভেদঃ
বাংলাদেশ জাতিসত্তার সূচনা লগ্ন থেকেই পরিবারকে আমরা যৌথ পরিবার হিসেবে চিনেছিলাম কিন্তু কালক্রমে সেটা একক পরিবারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় যৌথ পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ইন্টারেকশন টা বেশি ঘটে তাছাড়া যৌথ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করার সুযোগ থাকে বেশি সে কারণে যৌথ পরিবারের সন্তানরা একক পরিবারের সন্তানদের তুলনায় সহনশীলতা বা সেবার মনোভাব এমনকি নেতৃত্বের গুণাবলী ও বেশি দেখা যায়। আমার মনে হয় বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট তার পূর্বের মূল্যবোধ হারাতে বসেছে কারণ পারিবারিক শিক্ষা ক্রমান্বয়ে তার জৌলুষ হারাতে বসেছে। এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষা আমাদের পারিবারিক শিক্ষাকে গ্রাস করতে বসেছে যার প্রভাব সন্তানদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পারিবারিক শিক্ষায় নৈতিকতা অনুশীলনের গুরুত্বঃ
সকলে বিশ্বাস করেন যে মানব সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষা নিকেতন হলো তার পরিবার , ছেলে মেয়ে তার পারিবারিক জীবনে শিক্ষার সাথে মূল্যবোধ চেতনা, বিশ্বাস, আদর্শ সবকিছু তার মাতা পিতার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। পরিবার যখন ধর্মীয় বা আদর্শগতভাবে কাজ করে থাকে যখন পরিবারের সকল সদস্যই স্নেহ মমতা, আদর ভালোবাসার মাধ্যমে একটা পরিবার গড়ে তোলে, তখন একজন শিশুর কাছে পরিবার হয়ে ওঠে অনুকরণীয় নিদর্শন। এক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যখন একজন সন্তান তার পিতা-মাতার সান্নিধ্য শারীরিকভাবে বা মানসিক ভাবে পায় না তখন সে মানসিক শূন্যতায় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে ।কোন কোন ক্ষেত্রে একজন সন্তানের অধঃপতনের মূল কারণ একটা পরিবার ধর্মীয় বিধান যা একটা পরিবারকে
পবিত্র বন্ধনে সাথে আটকে দেয়।
পারিবারিক শিক্ষা যেন ব্যবহারিক শিক্ষা ঃ
প্লেটোর শিক্ষা তথ্যে বলা হয়েছে যে, ছয় বছর পর্যন্ত একজন শিশুকে আচরণ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। এ শিক্ষা বিদ্যালয়ের নয় বরং পরিবারের মধ্যে থেকেই করতে হবে। দশ বছর পর্যন্ত একজন শিশু তার মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করে। যদি তার শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে সাধিত হয় তাহলে তার পরবর্তী জীবনকাল অনেক সুন্দর হয়ে ওঠে। পরিবারের যারা বয়স্ক থাকেন তারা একজন শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অবশ্যই তাদের ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদান করেন এবং মানবিক কাজের মাধ্যমে তাদেরকে তাদের কাজের অনুসারী করে তোলেন ,যদি এমনটা না ঘটে তাহলে একজন শিশুর মানসিক বিকাশ পুরোপুরিভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনা।
পরিবার ভিত্তিক ধর্ম শিক্ষা ঃ
সমাজে এর আগে পরিলক্ষিত হতো যে, ধর্মচর্চার সাথে নৈতিকতার একটা সামঞ্জস্য ছিল যার কারণে সমাজে একজন শিশু বা কিশোর তার ধর্ম ভিত্তিক ধারণা পেত কিন্তু বর্তমান দেখা যায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রসারের অভাব,যদিও এটা পরিবার থেকে শুরু করা উচিত। আমরা মাঝে মাঝে এমন চিত্র দেখে থাকি যে, সন্তানের বইয়ের ব্যাগ তার অভিভাবক বহন করে নিয়ে চলেছে ,এটা কি ধরনের শিক্ষা? তাছাড়া লক্ষ্য করা যায় একজন শিশু- সন্তান পড়াশুনার চাপে তার ধর্ম চর্চা যথেষ্ট ব্যাঘাত ঘটে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সন্তানের মনোযোগতের প্রসারতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট বাধা প্রাপ্ত হতে হবে। গ্রাম্য ভাষায় একটা প্রবাদ শুনেছিলাম সেখানে বলা হয়েছে ,আম যদি মিষ্টি হয় তাহলে তার আঁটিও মিষ্টি হয় অর্থাৎ একটা পরিবারে যদি পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বা বড়রা ছোটদের প্রতি কিভাবে আচরণ করছে সেটা যদি শিশুরা পরিবার থেকে গ্রহণ করতে পারে তাহলে সে তার নিজস্ব জীবনে প্রয়োগ করাতে পারে। ধরুন একটা পরিবারে বাবা-মা ধর্মীয় আদর্শ পালন করে না অথবা বাবা মার প্রতি বা মা বাবার প্রতি যথেষ্ট মানবিক আচরণ করে না , তাহলে আমরা কি আশা করতে পারি যে সেই পরিবারের সন্তান মানবিক আচরণ করবে? পৃথিবীর সকল পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পরিবারকে তার সন্তানের আসল ঠিকানা বলে চিহ্নিত করেছেন বা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। এজন্য পরিবারকে একটা সুস্থ এবং ভারসাম্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ঃ
আমরা পূর্ব থেকেই জেনেছি পারিবারিক শিক্ষা পরিবার প্রদর্শন করে থাকে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রদর্শন করে থাকে। আমরা জানি, প্রতিষ্ঠানকে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়। আমার মনে হয় প্রতিষ্ঠানে একজন মানুষ তার পারিবারিক শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ করতে পারে কেবলমাত্র। আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের বিশ্বাস, ভরসা দিনদিন কমতে শুরু করেছে তার কারন প্রতিষ্ঠানে মানুষের সেবা প্রাপ্তির চেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় তুলনামূলক ভাবে বেশি। কোন প্রতিষ্ঠানে যারা সেবা দেয় তারা সে প্রতিষ্ঠানকে নিজের অজান্তেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে করতে একদিন সে প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করে ফেলে। বরাবরের মতোই সেবা গ্রহিতারা সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে প্রতারিত হয়ে থাকে বা কোন কোন সময় মানসিক কষ্ট পেয়ে থাকে যার কারণ হিসেবে ধরা যায় সে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা কর্মকর্তাগণ নিশ্চয়ই পারিবারিক শিক্ষায় কোন না কোন জায়গায় ত্রুটি রয়েছে। কোন সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই তার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা উচিত এবং এ কাজটি যারা করে থাকে তারা নিশ্চয়ই কোন না কোন ভাবে পরিবারের সাথে সংযুক্ত থাকে, এ জন্য পারিবারিক শিক্ষা গুরুত্ব যথেষ্ট আছে বলে আমার মনে হয়।
পরিশেষে বলতে চাই পারিবারিক শিক্ষা শুধু মনজগৎ নয় বরং বহির্জগত সম্পর্কে আমাদের জানতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষা খরচ বাবদ প্রায় ৭১% শতাংশ ব্যয় বহন করে থাকেন পরিবার। এ পরিমাণ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিনগুণ এবং কিন্ডারগার্ডেন প্রতিষ্ঠানে প্রায় নয় গুণের সমান। এ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় পারিবারিক শিক্ষা যথেষ্ট ভূমিকা রাখে একজন সন্তানের জন্য। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবারকে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার হওয়া হতে হবে তাহলেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম প্রগতিশীল এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে।
(লেখক: একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সহঃ সম্পাদক, দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা)