১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
স্টাফ রিপোর্টার : দিপংকর ঘোষ

পরিবারটির হাসি কেড়ে নিয়েছে বুলেটের আঘাত I স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে গুলিতে নিহত দুলাল মাহমুদ

  • প্রকাশিত ১১:৩৮:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুলাই ২০২৪
  • ২৪১ বার দেখা হয়েছে

দারিদ্র্যতাকে মাড়িয়ে সবেমাত্র এক যুগ হলো সুখের মুখ দেখেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ (৩৮)। ঘর করার জন্য গ্রামে কিনেছিলেন একটুকরো জমিও। বাবা-মা, স্ত্রী আর দুই ফুটফুটে সন্তানকে নিয়ে পেতেছিলেন সুখের সংসার। তবে সেসব আজ শুধুই স্মৃতি। বুলেটের আঘাত কেড়ে নিয়েছে গোটা পরিবারটির হাসি। ছেলে আর বাড়ি ফিরবে না, ডাকবে না মা বলে। এই কথা মনে করতেই ডুকরে কেঁদে উঠেন মা জলেখা বিবি। বিচার চান ছেলে হত্যার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল মাহমুদের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার চরখাগুটিয়া চৌকিদার কান্দি এলাকায়। সিদ্দিক খালাসী ও জলেখা বিবির সাত সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই দারুণ অর্থকষ্টে দিন কেটেছে তাদের। একদিকে বাবা কুষ্ঠরোগী, অন্যদিকে গরিব হওয়ায় ছোটবেলা থেকে কাজ শুরু করেন দুলাল। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কখনো চালিয়েছেন ভ্যান, আবার কখনো দিয়েছেন কৃষাণ।

২০০১ সালে পূর্ব নাওডোবা পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন দুলাল মাহমুদ। পরে ভাতের অভাবে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান মুন্সিগঞ্জ জেলায়। সেখানে একটি বাড়িতে লজিং থেকে শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক। এরপর ঢাকায় শুরু করেন চাকরির সন্ধান। ১৪ বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকে চাকরি হয় তার। সুদিন ফিরে আসে। ৮ বছর আগে বিয়ে করেন। বর্তমানে তার সংসারে ৭ বছরের আদিয়াত ও সাড়ে তিন বছরের আরিশা নামের দুটি সন্তান রয়েছেন।

গত ১৮ জুলাই বিকেল থেকেই ঢাকার আজিমপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিলো। এদিন অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন দুলাল মাহমুদ। তিনি বাসার সামনে গলির মাথায় আসতেই হঠাৎ করে এক ঝাঁক রাবার বুলেট এসে বিদ্ধ করে তার হাত আর পেটের অংশে। মুহূর্তের সব শেষ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দুলাল। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে নিয়ে স্থানীয়রা ছুটে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এর পরেরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় চির দিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। পরে গ্রামের বাড়িতে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

সরেজমিনে দুলাল মাহমুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার কিনে রাখা একখণ্ড জমির পাশে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা জলেখা বিবি তবজি জপে ছেলের জন্য দোয়া করছেন। ছেলের শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন বাবা সিদ্দিক খালাসীও। সন্তান দুলাল মাহমুদের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না মা জলেখা বিবি। তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তার।

জলেখা বিবি বলেন, ‘ছোটবেলা থিকা পোলারে দুইডা টাকা দিতে পারি নাই। নিজে বদলা দিয়া, মানুষের দোকানে কাম কইরা পড়ালেহা করছে। এহন সে চাকরি পাইছে। কিন্তু আমার নির্দোষ পোলাডারে মাইরা ফেললো। আমার বুক খালি কইরা, আমার নাতি-নাতকুর দুইডারে এতিম বানাইয়া দিলো। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

ছোট ভাই জসিম খালাসী বলেন, টাকার অভাবে আমরা ভাইরা আর কেউ পড়াশোনা করতে পারি নাই। দুলাল ভাই নিজে পড়াশোনার জন্য ভ্যান চালাইছে, মানুষের বাড়িতে কাম করছে। তিনিই আমাগো দেইখা রাখতো। আজ তিনি আর নাই। আমাদের একটাই দাবি ভাইয়ের পরিবারটির পাশে যেন সরকার দাঁড়ায়।

কোয়েল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দুলাল ভাই কখনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। এমনকি বেশি মানুষের ভিড় কিংবা আড্ডা পছন্দ করতেন না। আমরা শুনেছি, ওনি অনেক কষ্ট করে এই অবস্থানে এসেছেন। তাদের বাড়ি থেকে বর্ষায় রাস্তায় আসতে পানি পড়ে। তিনি গামছা পড়ে পানি পাড় হয়ে, জামাকাপড় পরিবর্তন করে স্কুলে যেতেন। খুব মেধাবী ছিলেন। তার এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের প্যানেল আইনজীবী রওসনআরা বলেন, জাজিরার দুলাল মাহমুদ ঢাকায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন। তার পরিবারে বৃদ্ধ মা-বাবা আর দুটি সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। এই অবস্থায় কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি বিপাকে পড়েছেন। আমরা চাই সরকার পরিবারটির পাশে দাঁড়াক।

Tag :

সংবাদ প্রকাশের জের ধরে তারাগঞ্জে সাংবাদিকে হুমকি দিলেন আবু সাঈদ হত্যামামলার আসামী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান

স্টাফ রিপোর্টার : দিপংকর ঘোষ

পরিবারটির হাসি কেড়ে নিয়েছে বুলেটের আঘাত I স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে গুলিতে নিহত দুলাল মাহমুদ

প্রকাশিত ১১:৩৮:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুলাই ২০২৪

দারিদ্র্যতাকে মাড়িয়ে সবেমাত্র এক যুগ হলো সুখের মুখ দেখেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ (৩৮)। ঘর করার জন্য গ্রামে কিনেছিলেন একটুকরো জমিও। বাবা-মা, স্ত্রী আর দুই ফুটফুটে সন্তানকে নিয়ে পেতেছিলেন সুখের সংসার। তবে সেসব আজ শুধুই স্মৃতি। বুলেটের আঘাত কেড়ে নিয়েছে গোটা পরিবারটির হাসি। ছেলে আর বাড়ি ফিরবে না, ডাকবে না মা বলে। এই কথা মনে করতেই ডুকরে কেঁদে উঠেন মা জলেখা বিবি। বিচার চান ছেলে হত্যার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল মাহমুদের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার চরখাগুটিয়া চৌকিদার কান্দি এলাকায়। সিদ্দিক খালাসী ও জলেখা বিবির সাত সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই দারুণ অর্থকষ্টে দিন কেটেছে তাদের। একদিকে বাবা কুষ্ঠরোগী, অন্যদিকে গরিব হওয়ায় ছোটবেলা থেকে কাজ শুরু করেন দুলাল। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কখনো চালিয়েছেন ভ্যান, আবার কখনো দিয়েছেন কৃষাণ।

২০০১ সালে পূর্ব নাওডোবা পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন দুলাল মাহমুদ। পরে ভাতের অভাবে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান মুন্সিগঞ্জ জেলায়। সেখানে একটি বাড়িতে লজিং থেকে শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক। এরপর ঢাকায় শুরু করেন চাকরির সন্ধান। ১৪ বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকে চাকরি হয় তার। সুদিন ফিরে আসে। ৮ বছর আগে বিয়ে করেন। বর্তমানে তার সংসারে ৭ বছরের আদিয়াত ও সাড়ে তিন বছরের আরিশা নামের দুটি সন্তান রয়েছেন।

গত ১৮ জুলাই বিকেল থেকেই ঢাকার আজিমপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিলো। এদিন অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন দুলাল মাহমুদ। তিনি বাসার সামনে গলির মাথায় আসতেই হঠাৎ করে এক ঝাঁক রাবার বুলেট এসে বিদ্ধ করে তার হাত আর পেটের অংশে। মুহূর্তের সব শেষ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দুলাল। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে নিয়ে স্থানীয়রা ছুটে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এর পরেরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় চির দিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। পরে গ্রামের বাড়িতে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

সরেজমিনে দুলাল মাহমুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার কিনে রাখা একখণ্ড জমির পাশে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা জলেখা বিবি তবজি জপে ছেলের জন্য দোয়া করছেন। ছেলের শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন বাবা সিদ্দিক খালাসীও। সন্তান দুলাল মাহমুদের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না মা জলেখা বিবি। তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তার।

জলেখা বিবি বলেন, ‘ছোটবেলা থিকা পোলারে দুইডা টাকা দিতে পারি নাই। নিজে বদলা দিয়া, মানুষের দোকানে কাম কইরা পড়ালেহা করছে। এহন সে চাকরি পাইছে। কিন্তু আমার নির্দোষ পোলাডারে মাইরা ফেললো। আমার বুক খালি কইরা, আমার নাতি-নাতকুর দুইডারে এতিম বানাইয়া দিলো। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

ছোট ভাই জসিম খালাসী বলেন, টাকার অভাবে আমরা ভাইরা আর কেউ পড়াশোনা করতে পারি নাই। দুলাল ভাই নিজে পড়াশোনার জন্য ভ্যান চালাইছে, মানুষের বাড়িতে কাম করছে। তিনিই আমাগো দেইখা রাখতো। আজ তিনি আর নাই। আমাদের একটাই দাবি ভাইয়ের পরিবারটির পাশে যেন সরকার দাঁড়ায়।

কোয়েল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দুলাল ভাই কখনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। এমনকি বেশি মানুষের ভিড় কিংবা আড্ডা পছন্দ করতেন না। আমরা শুনেছি, ওনি অনেক কষ্ট করে এই অবস্থানে এসেছেন। তাদের বাড়ি থেকে বর্ষায় রাস্তায় আসতে পানি পড়ে। তিনি গামছা পড়ে পানি পাড় হয়ে, জামাকাপড় পরিবর্তন করে স্কুলে যেতেন। খুব মেধাবী ছিলেন। তার এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের প্যানেল আইনজীবী রওসনআরা বলেন, জাজিরার দুলাল মাহমুদ ঢাকায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন। তার পরিবারে বৃদ্ধ মা-বাবা আর দুটি সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। এই অবস্থায় কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি বিপাকে পড়েছেন। আমরা চাই সরকার পরিবারটির পাশে দাঁড়াক।