নানা ভয়ভীতি ও ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। সত্য ঘটনা প্রকাশ করতে গিয়ে দেশে অগনিত সাংবাদিক তাদের জীবন হারাতে হয়েছে।অনেককে হাতপাসহ নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হারিয়ে অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তাদের এ যাপিত জীবন অনেক দুঃখ কষ্টের এবং বেদনাদায়ক।
ক্ষমতাসীন এবং প্রভাবশালীদের দাপট ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার কারণে নিহত সাংবাদিকদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন অনেক হত্যাকান্ডের বিচার পায়নি। হত্যাকান্ডের বিচার না পাওয়ায় নিহত সাংবাদিকের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন হতাশ এবং সাংবাদিকসমাজ বিক্ষুব্ধ। দেশে আলোচিত হত্যাকান্ডের মধ্যে সাগর রুনির হত্যাকান্ড অন্যতম। এ হত্যাকান্ডের বিচারও আজঅবধি হয়নি। অনুরুপভাবে দেশে অন্যান্য জেলার মত খুলনা জেলায়ও অনেক সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার। তার মধ্যে সাংবাদিক বেলাল হত্যাকান্ড অন্যতম।
গত দেড়যুগে পেশাগত কাজে খুলনায় দুর্বৃত্তদের হাতে সাংবাদিক বেলালসহ ৭জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন এবং অসংখ্য সাংবাদিক হামলা মামলা ও হয়রানির শিকার। এর মধ্যে রয়েছে যশোর থেকেপ্রকাশিত দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার বিএল কলেজ প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম রফিক যাকে ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চরাত ১০ টায় নগরীর বিএল কলেজের ক্যাম্পাসে র্দুবৃত্তরা হত্যা করে। খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক অনির্বাণ পত্রিকারউপজেলা প্রতিনিধি নহর আলী ২০০১ সালে ১৮ এপ্রিল খুলনা জেলার ডুমুরিয়ার পল্লীতে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিরসদস্যদের বেধডক মারধরে হাসপাতালে তিনদিন থাকার পর মৃত্যু বরণ করে। দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার ক্রাইমরির্পোটার হারুন অর রশিদ ২০০২ সালের ২ মার্চ খুলনা মহানগরীর মুজগুন্নী এলাকায় সন্ত্রসীদের গুলিতে নিহত হন।দৈনিক অনির্বাণ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি শুকুর আলী চরম পন্থীদের হাতে নিহত হন (২০০৩ সালের ৯ জুলাইডুমুরিয়া)।
দৈনিক সংবাদের খুলনার ব্যুরো প্রধান মানিক চন্দ্র সাহা ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনার প্রেসক্লাবেরঅদূরে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন। তিনি ঐ সময়ে খুলনার প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বিবিসি বাংলা বিভাগেরকন্ট্রিবিউটর ছিলেন। সাংবাদিক মানিক সাহার মেয়ে নাতাশা সাহা ও পর্শিয়া সাহা বাবার কথা শোনা মাত্রই বাকরুদ্ধহয়ে যায়। ন্যায় বিচারের আশা করতে সাহস পাচ্ছে না। বরং হত্যাকারীদের দ্বারা নিগৃত হচ্ছে এবং মামলা উঠানোরজন্য অহরহর ভয়ভীতির শিকার হচ্ছে।
খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু ২০০৪ সালের ২৭ জুন বোমা হামলায় নিহত হন। ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯ টার দিকে খুলনার প্রেসক্লাবের অর্ভ্যথনা কক্ষের সামনে মোটর সাইকেলের হ্যান্ডেলে সন্ত্রাসীদের রাখা রিমোট কন্ট্রোল বোমায় খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সহ সভাপতি, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের ব্যুরোপ্রধান শেখ বেলাল উদ্দিন গুরুতর আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পরেরদিন তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান।খুলনা সদর থানার এস আই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে আহত ও বিস্ফোরক আইনে দু’টিপৃথক মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে শাহাবুদ্দিন লস্কর ধীরা, এখলাসুর রহমান এখলাস, চরম পন্থী নেতারফিকুল ইসলাম ওরফে হাসান, ইকবাল হোসেন স্বাধীন ও মেরাজুল ইসলাম মেরাজ, রিক্সা চালক গদা ইউনুসকে হত্যামামলার আসামী করে চার্জশীট দাখিল করেন। সাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিন হত্যার বিচার নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকরে তার ছোট ভাই শেখ শামছুদ্দিন দোহা বলেন, “আমার ভাইয়ের হত্যা মামলায় কয়েকজনকে নাম মাত্র সাজা দেয়াহয় হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, মদদ দাতা ও অর্থ যোগান দাতাদের নাম আসেনি। ফলে আমার ভাইয়েরহত্যার প্রকৃত বিচার পায়নি”।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব, দৈনিক আমার দেশেরখুলনার ব্যুরো প্রধান এহতেশামূল হক শাওন বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতা নজির বিহীন ঝুঁকির মধ্যেপড়েছে”। ডেইলী স্টার ও বিডিনিউজ ২৪.কম (এপ্রিল ৪, ২০০৫) এর তথ্যমতে, গত ৫ জুলাই ২০০৫ শাহাবুদ্দিনলস্করকে ঢাকা সিআইডি অফিসের ম্যাধমে গ্রেফতার করা হয় এবং তাকে দুই দিন রিমান্ডে রাখা হয়। কোন তথ্য নাপাওয়াতে তাকে আরো পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্ছুরের আবেদন করা হয়। শাহাবুদ্দিন লস্কার ধীরা সাংবাদিক বেলাল হত্যারমূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ যোগান দাতা।
খুলনা ২৩ নং ওয়ার্ডের জামায়েতে ইসলামীর সভাপতি ও শাহাবুদ্দিন লস্কর ধীরার আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টির সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল। সাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিনশাহাবুদ্দিন লস্করের সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গেলে ধীরা তার উপর ক্ষিপ্ত হয়েউঠে এবং প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বার বার আক্রমণ করে। উল্লেখ্য, চরম পন্থী ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক শেখবেলাল উদ্দিন প্রথম কলম ধরেন। অবশেষে তারই প্রতিহিংসায় শাহাবুদ্দিন লস্কর ধীরা কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েসাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিনকে চির তরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে তার ভাই ডাক্তার শওকাত আলীলস্করের অর্থ সহায়তায় ঢাকায় হাউজিং ব্যবসা শুরু করে। জিয়ো প্রপার্টিজ নামে হাউজিং কোম্পানির এমডি হয়ে ব্যবসারনামে ছলচাতুরী ও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন। একই সাথে বায়োগ্রæপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বিপিএল হাউজিং এর প্রজেক্টডিরেক্টরের দায়িত্ব পেয়ে যান। এ প্রজেক্টের অর্থ কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়ে এবং কোটি কোটি টাকা আতœসাৎ করে যাকোম্পানির তদন্ত রিপোর্ট ও অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে।
এছাড়া মিথ্যা হত্যা মামলার নাটক সাজিয়ে মানুষকেনানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জিম্মি করে বিপুল অর্থবৃত্তের মালিক বনে যান। এভাবে অবৈধ সম্পদেরপাহাড় গড়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কলাবাগান থানাসহ রাজধানীর বিভিন্ন্ থানায়দেশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ১৪ টি জিডি করেন। উল্লেখযোগ্য জিডিগুলোর মধ্যে রয়েছে জিডি নং ১২৩ তাং০৩/০১/২০২৪ (হাতির ঝিল থানা), জিডি নং ২২০ তারিখ ০৫/০১/২০২৪ (রুপনগর থানা), জিডি নং ১৩৮ তারিখ০৩/০১/২০২৪ (রুপনগর থানা), জিডি নং ২২৬ তারিখ ০৩/০১/২০২৪ (মোহাম্মদপুর থানা), জিডি নং ৭৫০ তারিখ১১/০১/২০২৪ মোহাম্মদপুর থানা, জিডি নং ৭৩ তারিখ ০২/০১/২০২৪ আদাবর থানা, জিডি নং ১৩০ তারিখ০৩/০১/২০২৪ (কলাবাগান থানা), জিডি নং ১৫০৭ তারিখ ৩১/১২/২০২৩ (কলাবাগান থানা), জিডি নং ৫০৭ তারিখ৮/০১/২০২৪ (মোহাম্মদপুর থানা), জিডি নং ৪৪৬ তারিখ ০৯/০১/২০২৪ (ধানমন্ডি থানা), জিডি নং ৪২৩ তারিখ১০/০১/২০২৪ (আদাবর থানা), জিডি নং ৩৮৫ তারিখ ১০/০১/২০২৪ (কলাবাগান থানা), জিডি নং ৬৩৮ তারিখ১৫/০৯/২০২৪, জিডি নং ৬৪৮ তারিখ ১১/০৩/২০২৪।
কলাবাগান থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।দায়েরকৃত মামলা নাম্বার ৫ তারিখ ০৭/০৩/২০২৪। বর্তমানে সে গ্রেফতার এড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়েবেড়াচ্ছে। পুলিশ, র্যাব তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি-২০২৪ তারিখে খুলনা শহরে সাংবাদিক সমাজসংঘবদ্ধভাবে সকল সাংবাদিক হত্যার বিচারের দাবীতে মানব বন্ধন কর্মসূচী এবং প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। এপ্রতিবাদ সভায় আলোচকবৃন্দ সাংবাদিক হত্যার মদদ দাতা, পরিকল্পনাকারী ও অর্থ যোগান দাতাদের বিচারের দাবিতেসরকারের হস্থক্ষেপ কামানা করে গনমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়। এ সময় সাংবাদিক শেখ বেলালউদ্দিন হত্যার অন্যতম আসামী শাহাবুদ্দিন লস্কর ধীরার ফাঁসির দাবিতে খুলনা শহরের অলি গলিতে বিক্ষব্ধ সাংবাদিকসমাজের পোস্টার দেখা যায়।