১০:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ফারুক প্রধান :

রেনু আহমেদের গল্প মেঘ যখন ভেঙে পড়ে

  • প্রকাশিত ০১:১৮:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ মার্চ ২০২৫
  • ৩৭ বার দেখা হয়েছে

নয়টি গল্পের সমাহার মেঘ যখন ভেঙে পড়ে প্রতিটি গল্প যেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। জীবনের চোরাই উতরাই পোড় খাওয়া প্রতিটি চরিত্র বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি কখনো কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে হয়নি। জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশনা থেকে গল্পের বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি অমর একুশে বইমেলা ২০২৫।

প্রথম গল্প ছায়া আত্মা, ছায়ার যে ভিন্ন রুপ হতে পারে গল্পে তা উঠে এসেছে। ইচ্ছে হলো যে ট্রাক ড্রাইভার বাবাকে চাপা দিয়েছে ওর টুটিটা চেপে ধরে বলি, ‘তুই শুধু বাবাকেই মারিসনি, আমাদের গোটা পরিবারের এতোগুলা মানুষকে মেরেছিস।
ভাবতে ভাবতে দু-চোখে জল ছাপিয়ে এল। নিজের অজান্তেই বাবা, বাবা বলে ডুকরে কেঁদে উঠলো রিয়া।
গতকাল রাতে শাহীনা স্বপ্নে দেখা দিয়ে সব ঘটনা আমাকে বলেছে। তাই আমি আজকে এর সত্যতা দেখার জন্য এসেছি। কিন্তু এখন দেখছি ঘটনা সত্যি। আমাদের ক্ষমা করো মা। আমাদের ওর বাচ্চা নিয়ে এমনটা করা ঠিক হয় নাই। ও চাইছে না, তাই তোমাকেই মেরে ফেলার প্লান করেছিল। সৃষ্টি কর্তার অসীম কৃপায় তুমি বেঁচে গেছো। সব কথা শুনে রিয়া বোবা হয়ে গেল।

দ্বিতীয় গল্প প্রেমের মর্যাদা, যেমন জানালা দিয়ে খোলা আকাশটা না দেখলে ভালো লাগে না, তেমনি জানালা খুললে পড়ার টেবিলে ছেলেটাকে না দেখলেও ভালো লাগে না।
একদিন বিকেলবেলা পাশের দোকান থেকে কিছু কিনতে বেড়িয়েছে আদুরী, হঠাৎ দেখলো সেই ছেলেটা বই হাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আদুরী মুচকি হেসে তার সামনে যেতেই ছেলেটার হাত থেকে সবগুলো বই পড়ে গেল।
এরপর আদুরী জানালার কাছে গেলে ছেলেটা চা সাধে, ইশারায় কথা বলে। আদুরীও হাসে। বেশ একটা মজার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। রীতিমতো ইশারায় প্রেম।

তৃতীয় গল্প, বান্ধবী বিশেষ, আমরা বান্ধবীরা একটু ঈর্ষান্বিত হতাম এতো সুন্দর গড়নের। চেহারাটা গোলগাল কিন্তু হাসলে বোয়াল মাছের মত মুখ হয়ে যেত, এটা নিয়ে মাঝে মধ্যে ওকে বোয়াল মাছ ডাকতাম দুষ্টুমি করে।
যেহেতু আমি একটু সিলিম তাই আমার নাম দিল জিম আর ও ফর্সা গোলগাল তাই ওর নাম দিল ডেলা। জিম-ডেলার ভালোবাসা যেমন কোনদিন ফুরায়নি তেমনি আমাদের বন্ধুত্বের ফাটলও কোনদিন ধরেনি। এখন মনে হয় যথার্থ নাম-ই দিয়েছে বান্ধবীরা।
কয়েক বছর পর আমরা দুজনে আবার জুটি বাঁধলাম। ক্লাস শেষে আড্ডা মারা আমাদের প্রতি শুক্রবারের রুটিন হয়ে গেল। ক্লাসে যে বুঝে নাই তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার গ্রপিং ক্লাস হতে থাকলো। এর কিছুদিন পর আমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। ক্লাসে যেতেই পারভীন আমার এনগেজমেন্টের আংটিটা হাত থেকে খুলে নিল। আর বলতে লাগলো শোন বিয়েটা তুই সবার আগে শুরু কর আর আমি শেষ করবো আমাদের বান্ধবীদের মধ্যে। এই আংটিতে শুভ লক্ষণ আছে তাই ওটা কিছুদিন আমার হাতে থাক। এটার ছোঁয়ায় যদি আমার বিয়েটা হয়ে যায় এই আশায়। তারপর আমার বিয়ে হয় গেল। এর এক বছর পর পারভীনের ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু ওর বিয়েটা হলো না।
এর কয়েক বছর পর শুনি ও ব্রেইন স্ট্রোক করেছে। প্যারালাইসড হয়ে পড়ে আছে। খবরটা শুনে খুবই খারাপ লাগছিল। কলেজের সেই ফর্সা গোলগাল হাসিখুশি পারভীন আমার চোখে ভেসে উঠছে বার বার। আমার সেই প্রিয় বান্ধবী ডেলা।

চতুর্থ গল্প যাত্রী আমানত, এরকম প্রতিটি রিকশাওয়ালা ভেতর যদি এই যাত্রী আমানত মনটা জাগ্রত করা যেত তাহলে আমাদের নৈতিকতা অনেক অনেক দূর এগিয়ে যেত। কারোর জিম্মায় যাওয়া মানে তার কাছে সে আমানত। আর সেই আমানত রক্ষা করাই হলো তার মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার পরিচয়।

শকড গল্পের বিষয়টা এরকম, একদিন সকালে কাজের বুয়া নীচতলা থেকেই চীৎকার করে ডাকছে আপামনি, আপামনি গো—- তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন, আপনার সর্বনাশ হয়েছে। আপনার কপাল পুড়েছে গো! মহিমা কিছু বুঝতে পারলোনা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে গায়ে গাউনটা জড়িয়ে ড্রইং রুমে এসে দেখে লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে বউ সেজে এক মেয়ে সোফায় বসে আছে। আর তার স্বামী কানেকানে কি যেন বলছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো মহিমা। কিছু বুঝতে পারছে না। ওর বোধশক্তিটাও লোপ পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। এরপর হঠাৎ মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়লো। তারপর থেকে মহিমা আর কোনদিন কথা বলেনি। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে মহিমা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

গল্পের গাঁথুনি সহজ সরল পাত্র পাত্রি নিরেট গ্রাম থেকে উঠে আসা বিভিন্ন চরিত্রে রুপদান করেছে। মানবিক মর্যাদা ভাবগাম্ভীর্যের ভরা গল্পের প্লট ধীরে ধীরে সাসপেনশন তৈরি করে পাঠকে একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। লেখিকা রেনু আহমেদ পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার যে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। তার চিত্র পাঠকে ভাবিয়ে তুলেছে। বান্ধবী পারভীনের আর কোনদিন বিয়েই হলো না। বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে তার পুরো গল্পের কাহিনি। রিকশা ওয়ালা কিভাবে একহাতে রিকশা চালিয়ে লেখিকাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। মানুষের মনুষ্যত্ব জ্ঞান যদি রিকশা ওয়ালার মত হতো তাহলে পৃথিবীতে এতো কোলাহল মারামারি থাকতো না। ছায়া আত্মা যে স্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসে তারই একটি কাল্পনিক অস্তিত্ব তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন লেখিকা।

Tag :

টঙ্গীতে ভাড়াটিয়ার মাদক কারবার বন্ধের নির্দেশ প্রদান করায় বাড়িওয়ালাকে কুপিয়ে জখম করলো ভাড়াটিয়া

ফারুক প্রধান :

রেনু আহমেদের গল্প মেঘ যখন ভেঙে পড়ে

প্রকাশিত ০১:১৮:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ মার্চ ২০২৫

নয়টি গল্পের সমাহার মেঘ যখন ভেঙে পড়ে প্রতিটি গল্প যেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। জীবনের চোরাই উতরাই পোড় খাওয়া প্রতিটি চরিত্র বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি কখনো কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে হয়নি। জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশনা থেকে গল্পের বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি অমর একুশে বইমেলা ২০২৫।

প্রথম গল্প ছায়া আত্মা, ছায়ার যে ভিন্ন রুপ হতে পারে গল্পে তা উঠে এসেছে। ইচ্ছে হলো যে ট্রাক ড্রাইভার বাবাকে চাপা দিয়েছে ওর টুটিটা চেপে ধরে বলি, ‘তুই শুধু বাবাকেই মারিসনি, আমাদের গোটা পরিবারের এতোগুলা মানুষকে মেরেছিস।
ভাবতে ভাবতে দু-চোখে জল ছাপিয়ে এল। নিজের অজান্তেই বাবা, বাবা বলে ডুকরে কেঁদে উঠলো রিয়া।
গতকাল রাতে শাহীনা স্বপ্নে দেখা দিয়ে সব ঘটনা আমাকে বলেছে। তাই আমি আজকে এর সত্যতা দেখার জন্য এসেছি। কিন্তু এখন দেখছি ঘটনা সত্যি। আমাদের ক্ষমা করো মা। আমাদের ওর বাচ্চা নিয়ে এমনটা করা ঠিক হয় নাই। ও চাইছে না, তাই তোমাকেই মেরে ফেলার প্লান করেছিল। সৃষ্টি কর্তার অসীম কৃপায় তুমি বেঁচে গেছো। সব কথা শুনে রিয়া বোবা হয়ে গেল।

দ্বিতীয় গল্প প্রেমের মর্যাদা, যেমন জানালা দিয়ে খোলা আকাশটা না দেখলে ভালো লাগে না, তেমনি জানালা খুললে পড়ার টেবিলে ছেলেটাকে না দেখলেও ভালো লাগে না।
একদিন বিকেলবেলা পাশের দোকান থেকে কিছু কিনতে বেড়িয়েছে আদুরী, হঠাৎ দেখলো সেই ছেলেটা বই হাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আদুরী মুচকি হেসে তার সামনে যেতেই ছেলেটার হাত থেকে সবগুলো বই পড়ে গেল।
এরপর আদুরী জানালার কাছে গেলে ছেলেটা চা সাধে, ইশারায় কথা বলে। আদুরীও হাসে। বেশ একটা মজার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। রীতিমতো ইশারায় প্রেম।

তৃতীয় গল্প, বান্ধবী বিশেষ, আমরা বান্ধবীরা একটু ঈর্ষান্বিত হতাম এতো সুন্দর গড়নের। চেহারাটা গোলগাল কিন্তু হাসলে বোয়াল মাছের মত মুখ হয়ে যেত, এটা নিয়ে মাঝে মধ্যে ওকে বোয়াল মাছ ডাকতাম দুষ্টুমি করে।
যেহেতু আমি একটু সিলিম তাই আমার নাম দিল জিম আর ও ফর্সা গোলগাল তাই ওর নাম দিল ডেলা। জিম-ডেলার ভালোবাসা যেমন কোনদিন ফুরায়নি তেমনি আমাদের বন্ধুত্বের ফাটলও কোনদিন ধরেনি। এখন মনে হয় যথার্থ নাম-ই দিয়েছে বান্ধবীরা।
কয়েক বছর পর আমরা দুজনে আবার জুটি বাঁধলাম। ক্লাস শেষে আড্ডা মারা আমাদের প্রতি শুক্রবারের রুটিন হয়ে গেল। ক্লাসে যে বুঝে নাই তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার গ্রপিং ক্লাস হতে থাকলো। এর কিছুদিন পর আমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। ক্লাসে যেতেই পারভীন আমার এনগেজমেন্টের আংটিটা হাত থেকে খুলে নিল। আর বলতে লাগলো শোন বিয়েটা তুই সবার আগে শুরু কর আর আমি শেষ করবো আমাদের বান্ধবীদের মধ্যে। এই আংটিতে শুভ লক্ষণ আছে তাই ওটা কিছুদিন আমার হাতে থাক। এটার ছোঁয়ায় যদি আমার বিয়েটা হয়ে যায় এই আশায়। তারপর আমার বিয়ে হয় গেল। এর এক বছর পর পারভীনের ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু ওর বিয়েটা হলো না।
এর কয়েক বছর পর শুনি ও ব্রেইন স্ট্রোক করেছে। প্যারালাইসড হয়ে পড়ে আছে। খবরটা শুনে খুবই খারাপ লাগছিল। কলেজের সেই ফর্সা গোলগাল হাসিখুশি পারভীন আমার চোখে ভেসে উঠছে বার বার। আমার সেই প্রিয় বান্ধবী ডেলা।

চতুর্থ গল্প যাত্রী আমানত, এরকম প্রতিটি রিকশাওয়ালা ভেতর যদি এই যাত্রী আমানত মনটা জাগ্রত করা যেত তাহলে আমাদের নৈতিকতা অনেক অনেক দূর এগিয়ে যেত। কারোর জিম্মায় যাওয়া মানে তার কাছে সে আমানত। আর সেই আমানত রক্ষা করাই হলো তার মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার পরিচয়।

শকড গল্পের বিষয়টা এরকম, একদিন সকালে কাজের বুয়া নীচতলা থেকেই চীৎকার করে ডাকছে আপামনি, আপামনি গো—- তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন, আপনার সর্বনাশ হয়েছে। আপনার কপাল পুড়েছে গো! মহিমা কিছু বুঝতে পারলোনা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে গায়ে গাউনটা জড়িয়ে ড্রইং রুমে এসে দেখে লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে বউ সেজে এক মেয়ে সোফায় বসে আছে। আর তার স্বামী কানেকানে কি যেন বলছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো মহিমা। কিছু বুঝতে পারছে না। ওর বোধশক্তিটাও লোপ পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। এরপর হঠাৎ মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়লো। তারপর থেকে মহিমা আর কোনদিন কথা বলেনি। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে মহিমা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

গল্পের গাঁথুনি সহজ সরল পাত্র পাত্রি নিরেট গ্রাম থেকে উঠে আসা বিভিন্ন চরিত্রে রুপদান করেছে। মানবিক মর্যাদা ভাবগাম্ভীর্যের ভরা গল্পের প্লট ধীরে ধীরে সাসপেনশন তৈরি করে পাঠকে একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। লেখিকা রেনু আহমেদ পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার যে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। তার চিত্র পাঠকে ভাবিয়ে তুলেছে। বান্ধবী পারভীনের আর কোনদিন বিয়েই হলো না। বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে তার পুরো গল্পের কাহিনি। রিকশা ওয়ালা কিভাবে একহাতে রিকশা চালিয়ে লেখিকাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। মানুষের মনুষ্যত্ব জ্ঞান যদি রিকশা ওয়ালার মত হতো তাহলে পৃথিবীতে এতো কোলাহল মারামারি থাকতো না। ছায়া আত্মা যে স্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসে তারই একটি কাল্পনিক অস্তিত্ব তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন লেখিকা।