১১:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
লেখা:দেলোয়ার হোসেন

ফেনীতে বন্যা আমার চোখে আগস্টের ভয়াবহ বন্যা

  • প্রকাশিত ১১:০৬:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • ৩৮ বার দেখা হয়েছে

 

১৯ আগষ্ট, সোমবার রাত থেকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। সেদিন রাতেই ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সহায়তায় ফেনীতে রোপণের জন্য ১ হাজার ৬৬৫টি গাছের চারা পাঠায় বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ। পরদিন সকালে বৃষ্টির মধ্যেই চারাগুলো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। এর মধ্যেই বুধবার বৃষ্টিভেজা দুপুরে সোনাগাজীর মো. ছাবের সরকারি মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭০০ আমগাছের চারা বিতরণ হয়।

ওই দিন অর্থাৎ ২১ আগস্ট রাতে বৃষ্টির ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। রাতেই ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের উত্তর ধলিয়া বাগেরহাট (মনু মিজিবাড়ি) গ্রামে আমাদের বাড়িতে পানি উঠতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ২২ আগস্ট ফেনী বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

বৃহস্পতিবার থেকে বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। রাতের মধ্যে ঘরের ভেতর পানি চলে আসবে—এই আশঙ্কায় দুপুর থেকেই বাড়ির সবাই আসবাব গোছানো শুরু করেন। আশপাশের নয়টি পরিবার আমাদের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেয়। আরও আটটি পরিবার প্রতিবেশী বেলাল মিজি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করে। অন্যদিকে হৃদয়, খোকন, রেদোয়ান ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমি রাতের অন্ধকারে মধ্যে গলাপানির মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে চলে যাই উত্তর ধলিয়া বাগেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনে। আমাদের চোখে ঘুম নেই। রাত যত বাড়তে থাকে, বিদ্যালয় ভবনে মানুষের আসাও বাড়তে থাকে। রাত চারটা নাগাদ ভবন আশ্রিত মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

শুক্রবার থেকে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় সবার সঙ্গে। এদিন সকালে স্কুল থেকে বাড়িতে চলে আসি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেলাল মিজি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করি। সেখানে আইপিএস থাকায় মোবাইল চার্জ দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

 

পরদিন শনিবার সকালে বাড়ির কয়েকজন মিলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপোলে যাই। আমাদের বাড়ি থেকে লালপোলের দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটার। কিন্তু আমাদের যেতে লেগেছে দেড় ঘণ্টার বেশি সময়। কোথাও গলাপানি, কোথাও আবার বুকসমান। কখনো কলাগাছের ভেলায় চড়ে, কখনো হেঁটে ধীরে ধীরে আমরা পৌঁছে যাই। সবার বাড়িতে খাবার শেষ হয়ে যায়। ত্রাণের জন্য আমাদের এই চেষ্টা। লালপোলে প্রচুর ত্রাণের গাড়ি আটকা পড়েছিল। পানি বেশি হওয়ায় সোনাগাজীর রাস্তায় সেগুলো ঢুকতে পারছিল না।

একদিকে পানির প্রবল স্রোত, অন্যদিকে খাবারের জন্য আমাদের অপেক্ষা। ত্রাণের গাড়িতে থাকা মানুষের কাছে শুকনা খাবার ও পানি চাই, জিজ্ঞেস করি মোমবাতি দেওয়া যাবে কি না? কেউ কেউ দিয়েছেন, আবার কেউ মুখের ওপর সরাসরি না বলে দেন। কী যে কষ্টের মুহূর্ত ছিল, বলে বোঝানো যাবে না। তখন কিন্তু বাড়িতে মাছ, মাংস, চাল, ডাল—সবকিছু ছিল; ছিল না জ্বালানি আর আলো। এমন অসহায়ত্ব জীবনে আর কখনো লাগেনি। লালপোলের একটু সামনে স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে পানির প্রবল স্রোতে দেখলাম একজন মৃত মানুষের লাশ ভেসে আছে। চারদিকে পানি আর পানি। কিছু করারও ছিল না। আমরা বেশ কিছু ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি।

ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে, আমরা খেতে পারছি না। ক্ষুধায় বাড়ির শিশুরা কাতর। আর পানি চাইলে বলে আপনি ট্যুরিস্ট!

রোববার সকালে আবার বাড়ির সবাই মিলে কিছু টাকা সংগ্রহ করে হেঁটে চলে যাই ফেনী শহরে। সেখান থেকে কিছু শুকনা খাবার ও কয়েল, আলু, ডাল—এগুলো কিনি। তিনটি মোমবাতির দাম রাখে ৩০০ টাকা! কী যে এক ভয়াবহ অবস্থা। মানুষও উপায়ন্তর না পেয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

অন্য জেলা থেকে অসংখ্য মানুষ ত্রাণ নিয়ে ফেনী শহরে আসেন। তাঁদেরই একজনের কাছে আমাদের মধ্য থেকে একজন যখন পানি চায়, তিনি বলেন, ‘ভাই, আপনি তো ট্যুরিস্ট।’

এই ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে, আমরা খেতে পারছি না। ক্ষুধায় বাড়ির শিশুরা কাতর। আর পানি চাইলে বলে আপনি ট্যুরিস্ট! একটি মোমবাতির জন্য গাড়ির পেছনে দৌড়ানো লাগলে তা–ও দেয়নি মোমবাতি। ত্রাণের প্যাকেটর জন্য মানুষের ধারে ধারে যাওয়া লাগে।

ফেনী শহরে শত শত নৌকা থাকবে, কেউ কখনো চিন্তাও করেনি। রাতে অন্ধকারে শোনা যায় মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ। রাত তিনটা বাজে মসজিদের মাইকে বলে চোর চোর।

আগস্টের এই বন্যা আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছে। ত্রাণ নিয়ে কী পরিমাণ যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। এই বৈষম্য তৈরি করা আমাদের উচিত হয়নি। বন্যায় ফেনী জেলার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ আগস্ট—এই ছয় দিন মানুষ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ফেনী বন্ধুসভা,

Tag :

টঙ্গীতে ভাড়াটিয়ার মাদক কারবার বন্ধের নির্দেশ প্রদান করায় বাড়িওয়ালাকে কুপিয়ে জখম করলো ভাড়াটিয়া

লেখা:দেলোয়ার হোসেন

ফেনীতে বন্যা আমার চোখে আগস্টের ভয়াবহ বন্যা

প্রকাশিত ১১:০৬:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

 

১৯ আগষ্ট, সোমবার রাত থেকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। সেদিন রাতেই ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সহায়তায় ফেনীতে রোপণের জন্য ১ হাজার ৬৬৫টি গাছের চারা পাঠায় বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ। পরদিন সকালে বৃষ্টির মধ্যেই চারাগুলো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। এর মধ্যেই বুধবার বৃষ্টিভেজা দুপুরে সোনাগাজীর মো. ছাবের সরকারি মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭০০ আমগাছের চারা বিতরণ হয়।

ওই দিন অর্থাৎ ২১ আগস্ট রাতে বৃষ্টির ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। রাতেই ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের উত্তর ধলিয়া বাগেরহাট (মনু মিজিবাড়ি) গ্রামে আমাদের বাড়িতে পানি উঠতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ২২ আগস্ট ফেনী বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

বৃহস্পতিবার থেকে বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। রাতের মধ্যে ঘরের ভেতর পানি চলে আসবে—এই আশঙ্কায় দুপুর থেকেই বাড়ির সবাই আসবাব গোছানো শুরু করেন। আশপাশের নয়টি পরিবার আমাদের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেয়। আরও আটটি পরিবার প্রতিবেশী বেলাল মিজি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করে। অন্যদিকে হৃদয়, খোকন, রেদোয়ান ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমি রাতের অন্ধকারে মধ্যে গলাপানির মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে চলে যাই উত্তর ধলিয়া বাগেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনে। আমাদের চোখে ঘুম নেই। রাত যত বাড়তে থাকে, বিদ্যালয় ভবনে মানুষের আসাও বাড়তে থাকে। রাত চারটা নাগাদ ভবন আশ্রিত মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

শুক্রবার থেকে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় সবার সঙ্গে। এদিন সকালে স্কুল থেকে বাড়িতে চলে আসি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেলাল মিজি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করি। সেখানে আইপিএস থাকায় মোবাইল চার্জ দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

 

পরদিন শনিবার সকালে বাড়ির কয়েকজন মিলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপোলে যাই। আমাদের বাড়ি থেকে লালপোলের দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটার। কিন্তু আমাদের যেতে লেগেছে দেড় ঘণ্টার বেশি সময়। কোথাও গলাপানি, কোথাও আবার বুকসমান। কখনো কলাগাছের ভেলায় চড়ে, কখনো হেঁটে ধীরে ধীরে আমরা পৌঁছে যাই। সবার বাড়িতে খাবার শেষ হয়ে যায়। ত্রাণের জন্য আমাদের এই চেষ্টা। লালপোলে প্রচুর ত্রাণের গাড়ি আটকা পড়েছিল। পানি বেশি হওয়ায় সোনাগাজীর রাস্তায় সেগুলো ঢুকতে পারছিল না।

একদিকে পানির প্রবল স্রোত, অন্যদিকে খাবারের জন্য আমাদের অপেক্ষা। ত্রাণের গাড়িতে থাকা মানুষের কাছে শুকনা খাবার ও পানি চাই, জিজ্ঞেস করি মোমবাতি দেওয়া যাবে কি না? কেউ কেউ দিয়েছেন, আবার কেউ মুখের ওপর সরাসরি না বলে দেন। কী যে কষ্টের মুহূর্ত ছিল, বলে বোঝানো যাবে না। তখন কিন্তু বাড়িতে মাছ, মাংস, চাল, ডাল—সবকিছু ছিল; ছিল না জ্বালানি আর আলো। এমন অসহায়ত্ব জীবনে আর কখনো লাগেনি। লালপোলের একটু সামনে স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে পানির প্রবল স্রোতে দেখলাম একজন মৃত মানুষের লাশ ভেসে আছে। চারদিকে পানি আর পানি। কিছু করারও ছিল না। আমরা বেশ কিছু ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি।

ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে, আমরা খেতে পারছি না। ক্ষুধায় বাড়ির শিশুরা কাতর। আর পানি চাইলে বলে আপনি ট্যুরিস্ট!

রোববার সকালে আবার বাড়ির সবাই মিলে কিছু টাকা সংগ্রহ করে হেঁটে চলে যাই ফেনী শহরে। সেখান থেকে কিছু শুকনা খাবার ও কয়েল, আলু, ডাল—এগুলো কিনি। তিনটি মোমবাতির দাম রাখে ৩০০ টাকা! কী যে এক ভয়াবহ অবস্থা। মানুষও উপায়ন্তর না পেয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

অন্য জেলা থেকে অসংখ্য মানুষ ত্রাণ নিয়ে ফেনী শহরে আসেন। তাঁদেরই একজনের কাছে আমাদের মধ্য থেকে একজন যখন পানি চায়, তিনি বলেন, ‘ভাই, আপনি তো ট্যুরিস্ট।’

এই ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে, আমরা খেতে পারছি না। ক্ষুধায় বাড়ির শিশুরা কাতর। আর পানি চাইলে বলে আপনি ট্যুরিস্ট! একটি মোমবাতির জন্য গাড়ির পেছনে দৌড়ানো লাগলে তা–ও দেয়নি মোমবাতি। ত্রাণের প্যাকেটর জন্য মানুষের ধারে ধারে যাওয়া লাগে।

ফেনী শহরে শত শত নৌকা থাকবে, কেউ কখনো চিন্তাও করেনি। রাতে অন্ধকারে শোনা যায় মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ। রাত তিনটা বাজে মসজিদের মাইকে বলে চোর চোর।

আগস্টের এই বন্যা আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছে। ত্রাণ নিয়ে কী পরিমাণ যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। এই বৈষম্য তৈরি করা আমাদের উচিত হয়নি। বন্যায় ফেনী জেলার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ আগস্ট—এই ছয় দিন মানুষ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ফেনী বন্ধুসভা,