একজন স্বপ্নচারী মানুষের জীবন বৈচিত্র্য একটু অন্যরকম হবে বৈকি! অন্তত একজন হতাশাগ্রস্হ দুর্বল চিত্ত মানুষের চেয়েতো বটেই, যার কাছে পৃথিবী এক ধূসর-বিবর্ণ-অর্থহীন, ব্যর্থতায় ভরা লোনাজল আর অনুর্বর মরুভূমি মাত্র।
বলছিলাম স্বপ্নচারী মানুষের কথা- সফল যত জীবন আলেখ্য আর জীবনের সকল সৌন্দর্যের বর্ণনা আমরা পেতে পারি ডেল কার্নেগী অথবা ডক্টর লুৎফর রহমানের মত মহাজ্ঞানী এবং বাস্তবদর্শী মহামানবদের লেখনিতে। তদুপরি এ বিষয়ে আমি আজ একটি কলাম লেখার দুঃসাহস কিছুতেই নিবৃত করতে পারছি না, এতদসত্ত্বেও কিছুটা শংকা ও দুর্বলতা তো থেকেই যায়, যা সচেতন জ্ঞানীগুণী পাঠক মাত্রই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন যাত্রার মানেও এসেছে আমুল পরিবর্তন, এতে কিছু মাত্র সন্দেহ নেই, তবে তথ্য-প্রযুক্তির দুর্দান্ত গতি আমাদের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি আর মানবিক জীবন যাপনের অনেকখানি ভাসিয়ে নিয়ে- ফেলেছে অন্ধকার সমুদ্রের অতল গহীনে, এতেও সন্দেহ নেই। সেই আলোচনা না হয় অন্য কোন সময় করা যাবে। আজ শুধু আমাদের তরুণ সমাজের স্বপ্নচারিতা নিয়ে লিখতে চাই। যেখানে আমাদের কোমলমতি সন্তানদের এখন সর্বোচ্চ স্বপ্ন একজন “টিকটকার” কিংবা “ইউটিউবার” হওয়ার, সেখানে আমরা অভিভাবক তথা দেশ ও জাতি তাদের থেকে আর কি আশা করতে পারি? স্বপ্নই তো মানুষকে সমৃদ্ধির সোপান দেখায়, পৌঁছে দেয় সমৃদ্ধির স্বর্ণ চূড়ায়, তবে তার আগে কেমন স্বপ্ন দেখতে হবে সেটা জানা প্রয়োজন। আর এই স্বপ্ন দেখার পদ্ধতি নিয়ে অনেক মনীষীগণ অনেক ভাবেই তাদের লেখনীতে বর্ণনা করেছেন। আজকের তরুণ সমাজের জন্য অবশ্যই যেটা জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে ” Target should be high” অর্থাৎ লক্ষ্য স্থির করতে হবে অনেক উচ্চতায়। বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের অনেকেরই কেউ কবর খানার দারোয়ান, কেউ ফেরিওয়ালা কিংবা খেয়া নৌকার মাঝি, অথবা কেউ মাত্র ১৬ টাকা পকেটে নিয়ে রেল স্টেশনে ঘুমিয়ে, বাদাম বিক্রি করে শুধু মাত্র স্বপ্নের তাড়নায় বিশ্ব বরেন্য ধনকুবের কিংবা মহা মনিষীদের কাতারে আজ দাঁড়িয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে জনাব এ পি জে আব্দুল কালাম স্যারের একটি উক্তি খুবই যথার্থ বলে আমি মনে করি, “স্বপ্ন তা নয় যেটি তুমি ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না” অত্যন্ত বাস্তবতা সমৃদ্ধ কথা , অতঃপর যদি একটু উচ্চ মার্গে বলি, একজন সৈনিক যদি কোন শত্রুকে টার্গেট করে গুলি করার সময় ১০০ মিটারে সাইট সিলেকশন করার পর ৩০০ মিটার দূরত্বে অবস্থানরত শত্রুকে ফায়ার করে, তবে উপযুক্ত ট্রাজেকটরি প্রাপ্ত না হওয়ায় কখনোই শত্রু নিধন সম্ভব হবে না। তবে ১০০ মিটার কিংবা তার আশেপাশে অবস্থানরত কোন শত্রু ফায়ার আক্রান্ত হলেও হতে পারে। এবার একটু নিচু মার্গে অর্থাৎ সহজ ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক, ছোটবেলায় নিশ্চয়ই ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার অভিজ্ঞতা বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে আপনার আছে। যদি কিনা আপনি নিতান্ত শহর কেন্দ্রিক জীবন যাপনের বাইরে অন্য পৃথিবী সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ না হন অথবা পাট গাছে তক্তা হয় কিনা এ ব্যাপারে আপনি ওয়াকিবহাল না হন। বলছিলাম ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার কথা- ধরুন আপনার হাতের লাগালে মাত্র ১০ মিটারের কম দূরত্বে একটি গাছের ডালে একটি পাকা আম ঝুলছে। স্বভাবতই সেটার প্রতি আপনার লোভ হতে পারে। আপনার হাতের কাছে সহজে একটি ইটের টুকরাও পেয়ে গেলেন। এক ঢিলেই কেল্লাফতে। ভুতলগামী পাকা আম মাটিতে পড়তে দিলেন না, ভালো ফিল্ডার হিসেবে একটি দারুন ক্যাচ লুফে নিলেন। কি আনন্দ আকাশে! বাতাসে!
ঢিলটি কোথায় গেল দেখার প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন থাকারও কথা নয়। এমনকি আমটি আপনার করতলগত হওয়ার ব্যাপারটিও আমার আলোচনার বিষয় নয়। একবার ভাবুন তো মাত্র ১০ মিটার দূরের যে আমটি পাওয়ার জন্য আপনি ওটাকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়েছিলেন এবং সেই ঢিলটি ছুড়তে যতটুকু পরিমাণ পেশি শক্তি ও মনোযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন, তাতে কি ৫০ মিটার দূরে থাকা কোন বস্তুর কাছে আপনার ঢিলটি পৌঁছানোর কথা? ভুতলগামী করা তো অনেক পরের কথা। আরো বলা যায় ১০ মিটার লম্বা গাছে চড়তে হয়তো আপনি ১০ মিটার বড়জোর ১২ মিটার লম্বা মই তৈরি করবেন, নিশ্চয়ই সে জন্য আপনাকে ৫০ মিটার লম্বা মই তৈরি করতে হবে না এ কথা ঠিক। হ্যাঁ তবে ৫০ মিটার দূরে লক্ষ্য স্থির করলে ঢিলটি ৫০ মিটার দূরত্ত্বে কিংবা তার বিকটবর্তী কোন দূরত্বে (কাছে বা দূরে) তার গন্তব্য শেষ করবে। অনুরূপভাবে ১০ মিটার দূরত্বে লক্ষ্য স্থির করলে আপনার গন্তব্য ঠিকই ১০ মিটার কিংবা তার আশেপাশেই নির্ধারিত হবে। সুতরাং জীবনের লক্ষ্য সব সময়ই উঁচুতেই স্থির করতে হয়। চূড়ান্ত লক্ষ্যে না পৌঁছালেও তার কাছাকাছি আপনার গন্তব্য নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত লক্ষে না পৌঁছার অন্য কোন কারণ নেই, তবে যদি আপনি কোন কারণে ব্যর্থ হন সে শুধু আপনার লক্ষ্য স্থির করতে সূক্ষ্ম ভুলের কারণেই হতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় আপনার লক্ষ্য স্থির ঠিক যতটা উঁচুতে হবে আপনার গন্তব্য ঠিক ততটা কিংবা তার কাছাকাছি হতে বাধ্য অর্থাৎ আপনার লক্ষ্য স্থির যদি হয় ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বিসিএস ক্যাডার,বড় ব্যবসায়ী কিংবা অনুরূপ কিছু এবং আপনি সেই লক্ষ্যে লক্ষ্য স্থির করে আপনার মেধা ও সময়কে কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন, তবে সাফল্য আপনার আসবেই। হয়তো কোন সূক্ষ্ম ভুলের কারণে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও অন্তত তার আশেপাশে কোথাও আপনার অবস্থান হতে বাধ্য। এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল যে অনেক বড় স্বপ্ন দেখে এবং প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করে পরিণত বয়সে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছেন। এমনটি যদি কোন ব্যক্তি বিশেষ এর ভাষ্যমতে হয়ে থাকে, তবে পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তি মাত্রই উদঘাটন করতে সক্ষম হবেন যে এর পিছনে বিশাল কোন গলদ রয়েছে। শুরু থেকেই আপনার লক্ষ্যই যদি এমন হয় যে – কোন রকমে পিয়ন কিংবা ঝাড়ুদারের সমতুল্য একটি কাজ পেলেই জীবনের জন্য যথেষ্ট, তবে আপনার সর্বোচ্চ অর্জন হতে পারে ঠিক সেরকমই, তার উপরে কিছু নয়।
আরেকটু সহজ করে এবং ছোট করে যদি বলি ছোটবেলা থেকেই আপনি স্বপ্ন দেখে আসছেন আপনি একটি প্রাইভেট কারের মালিক হতে চান, এবং সেই লক্ষ্ অনুযায়ী কাজ করে চলছেন, তবে অবশ্যই আপনি সেটা পেতে পারেন প্রাইভেট কার না হোক আপনার একটা মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য হবেই এতে কোন সন্দেহ নেই। আর যদি আপনার সর্বোচ্চ স্বপ্নই হয় একটি বাইসাইকেল তবে সর্বোচ্চ বাইসাইকেলটির মালিক হতে পারেন, তার উপরে কিছু নয়। আর যদি এরই মধ্যে সূক্ষ্ম ভুল ভ্রান্তির শিকার হন হয়তো সেটিও সম্ভব হবে না।
প্রকৃতির নিয়মেও এর ব্যত্যয় হয় না, যেমন ধরুন আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে একটি বিলাসবহুল বাসে চড়ে রওনা করলেন পথিমধ্যেই আপনার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল আপনার জানা আছে সামনে মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তার পর একটি ফিলিং স্টেশন আছে এবং সেখানে গাড়িটি নিয়মিত থামে। আপনি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করলে দেখতে পাবেন ৮-৯ মিনিটের মাথায় আপনার ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে যাচ্ছে। ১০ মিনিটের মাথায় আপনি শান্তি ফিরে পেলেন।
কিন্তু ঠিক অনুরূপ পরিস্থিতিতে যদি আপনার প্রকৃতির ডাক অনুভূত হওয়ার পর থেকে ফিলিং স্টেশনের অবস্থান ৫ মিনিটের ব্যবধানে হতো আর আপনি যদি পরবর্তী পাঁচ মিনিটের লক্ষ্য নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকতেন, তখন তিন থেকে চার মিনিটের মাথায় আপনার ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে যাচ্ছে বলে মনে হতো। আর কোন অবস্থায় যদি উক্ত ফিলিং স্টেশনে গাড়ি না থামিয়ে গাড়িটি ফিলিং স্টেশন অতিক্রম করে যেতো, তবে তো কথাই নেই- সাত থেকে আট মিনিটের মধ্যেই অবস্থা খারাপ! এক্ষেত্রে মনস্থির বা লক্ষ্য স্থির অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।
ধরুন বাজার করা শেষে একটি বড় বাজারের ব্যাগ হাতে করে আপনি বাড়ির পথে রওনা করেছেন। গ্রামের পথ কোন যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না, আপনার বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, অগত্যা হাঁটতে শুরু করলেন। লক্ষ্য করলে দেখবেন বাড়ির কাছাকাছি অর্থাৎ ১০০ থেকে ২০০ গজের মধ্যে এসেই আপনার বেশি কষ্ট অনুভূত হচ্ছে। ঠিক অনুরূপভাবে আপনার বাড়ি যদি বাজার হতে ২ কিলোমিটার দূরে হতো সেক্ষেত্রেও আপনি বাড়ির কাছাকাছি এসে অর্থাৎ ১০০ হতে ২০০ মিটারের মধ্যে এসে বেশি হলে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে এসেই অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও কষ্ট অনুভূত হত। এটাই স্বাভাবিক আপনার মাইন্ড সেটআপটাই আসল কথা এবং সেটাই আপনার লক্ষ্যে পৌঁছার পথকে সহজ ও সুগম করে।
আপনি যখন এক হাজার টাকা বাজেট ধরে একটি শার্ট কেনার জন্য বাজারে যান আর, আপনার পছন্দের একটি শার্ট যদি কোনভাবেই বিক্রেতা এগারোশো টাকার কমে না দেন, তখন আপনার মনের অবস্থাটা বুঝুন। আর যদি আপনার একান্ত পছন্দের শার্টটি আপনার বাজেটের চেয়ে মাত্র ৫০ টাকা কমে অর্থাৎ ৯৫০ টাকায় পেয়ে যান, তাহলে আপনার আনন্দটাও কম নয়। সুতরাং আমরা সব সময় জীবনের লক্ষ্য সর্বদা উঁচুতে স্থির করব।।অতঃপর তদানুযায়ী সাধ্য পরিমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করবো। সফলতা আসবেই, আসতে বাধ্য ইনশাআল্লাহ।
১০:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
তারুন্যের অনুপ্রেরনা : স্বপ্ন হোক আকাশ ছোঁয়া
Tag :
জনপ্রিয়