১১:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রাজু আলীম :

ড. ইউনূসকে আমি ব্লাইন্ডলি সাপোর্ট করি: এম আনিস উদ দৌলা

  • প্রকাশিত ০২:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৫
  • ২৩ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে এম. আনিস উদ দৌলা কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং একজন চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে সমাদৃত। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, গভীর প্রজ্ঞা এবং দেশের প্রতি তার অবিচল বিশ্বাস তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সম্প্রতি তিনি দেশ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমকালীন প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন, কবি এবং সাংবাদিক রাজু আলীমের সাথে। এই সময়ের বিভিন্ন চিত্র তার আলোচনা ও বক্তব্যে প্রকাশ পায় তাঁর কথোপকথনে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, শিল্পের গতিপথ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়েও নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করেছেন তিনি। যা একত্রিত করলে একটি দেশের পথচলার সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। তার প্রতিটি কথার মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা নয়, বরং এক অবিচ্ছিন্ন অনুভূতির প্রবাহ।
বর্তমানের সমাজবাস্তবতায় তিনি দেশের ছাত্র আন্দোলন, পরিস্থিতি এবং তাঁর চোখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশের যে পরিবর্তন এসেছে, এটা এমন একটা পরিবর্তন যা পৃথিবীর কোথায় এসেছে বা কোথায় আসেনি তা আমি বলতে পারবো না। পরিবর্তনের এই সুযোগটা সবসময় আসে না। পরিবর্নের জন্য যে উদ্যম প্রয়োজন তা সবসময় আসে না। আমাদের জাতীয় জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের প্রতিটি নাগরীকের। দেশকে যার যেখানে যা যতটুকু সুযোগ আসে ততটুকুই কন্ট্রিবিউট করা উচিত।
কেউই বলতে পারবে না আমি একেবারে সাদা। সবাই গ্রে। যে সুযোগটা আমরা পেয়েছি সেই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগানো উচিত। ড. ইউনূসের মতো একজন বিজ্ঞ এবং বিশ্বব্যপী গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বাংলাদেশের ভার নিয়েছেন, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। তাকে আমাদের সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করা উচিত।
ছাত্ররা ছাত্রই। তারা পড়াশোনা করে, জ্ঞান অর্জন করে দেশের প্রতি যতটুকু সম্ভব সহায়তা করবে। রাজনীতি কোন বিজনেস তো না। পলিটিক্স হচ্ছে দেশ সেবা।
দেশের ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের বিষয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশের একটি অসাধারণ বিষয় যে ছাত্ররা দেশের ক্রান্তিকালে এগিয়ে আসে। দেশকে নিয়ে ভাবে। কিন্তু ছাত্ররা ছাত্র। ছাত্ররা এই পরিবর্তন আনতে পেরেছে কারণ তাদের কোন ভিন্ন স্বার্থ নেই। আমরা পেশাগত কাজে জড়িত। চাকরি অথবা পেশাগত জীবন আছে। পারিবারিক পিছুটান আছে। ছাত্রদের পিছুটান কম। সে কারণে দেশের জন্য তারা জীবন দিতে পারে। কিন্তু আমরা লুকিয়ে থাকি। পারিবারিক কারণে। আমাদের দেশের ছাত্ররা দেশকে কেনজানি এতই ভালোবাসে, তারা দেশের জন্য জীবন দিতে পারে।
আমাদের দেশে গুড গভর্নেন্স দরকার। আমাদের ছাত্ররা সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আমাদের সেই সুযোগটা সর্বাঙ্গীন ভাবে নেয়া উচিত। সহযোগীতা করা উচিত। তাকে বিশ্বাস করা উচিত। পলিটিকস যদি হয় আর্নিংয়ের একটি সুযোগ তবে দেশটা কোন দিকে যাবে। ড. ইউনূসকে আমি ব্লাইন্ডলি সাপোর্ট করি। হি ইস আ ম্যান উইথ নো ওয়েস্টার্ন ইন্টারেস্ট।
বর্তমানে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছেন তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা আমাদের সম্পদ। তারা অসাধারণ মানুষ। তারা দেশের এই দুর‌্যোগের মধ্যে ছাত্রদের আমন্ত্রনে দেশ গঠনে এসেছে। আমাদের তাদের সম্মান করা উচিত। এখন কি হচ্ছে বলার সময় না। এখন সময় তাদের সহায়তা করার। পরিবর্তনের ধারায় এগিয়ে যাবার চেষ্টা করা। দেশের ইন্টারেস্টে কাজ করা উচিত। ইউথ অনেস্টি। ভালো নিয়ত নিয়ে। কেবল বলার জন্য বলা না। সত্যিকার অর্থে সততা এবং সৎ নিয়ত নিয়ে সহায়তা করা।
দেশের সামগ্রীক ব্যবসায়িক নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দর্শন কোনো তাত্ত্বিক আদর্শ নয়, বরং তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অনুধাবন। তিনি মনে করেন, একটি শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে পারে না। মুনাফা অবশ্যই ব্যবসার প্রাণ, কিন্তু তা অর্জন করতে হবে সঠিক পথে চলে, যেখানে গ্রাহকের আস্থা, কর্মীদের কল্যাণ এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি একান্তে বলেন, “ব্যবসার একটি সঠিক পথ আছে, এবং সেই পথেই আমাদের চলতে হবে।” এই দর্শন এসিআই-এর মতো একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সাময়িক লোভের বানে গা না ভাসিয়ে সঠিক পথটি অনুসরণ করলে যেকোনো প্রতিকূলতা এড়ানো সম্ভব, এবং এটিই একটি প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন ব্যবসায়িক নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে দ্রুত লাভের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা প্রবল, তখন আনিস উদ দৌলার এই অবস্থান যেন এক স্থির বাতিঘর। তাঁর মতে, শর্টকাট বা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে সাময়িক সাফল্য হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু তা একটি জাতির অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি মূল্যবোধ তৈরি করা, যা কেবল আর্থিক সম্পদ নয়, বরং সমাজের কাছে বিশ্বাস ও সম্মান অর্জন করে। এসিআই তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে যে উদাহরণ স্থাপন করেছে, তা প্রমাণ করে যে মুনাফা এবং নৈতিকতা পরস্পর বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। কৃষি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে, তারা কেবল লাভজনকতার দিকেই মনোযোগ দেয় না, বরং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও আগ্রহী। তাঁর এই নীতিগত অবস্থান শুধু এসিআই-এর জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
তাঁর ভাবনায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার এবং বেসরকারি শিল্প খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও সহযোগী সম্পর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে কারণ সরকার বরাবরই শিল্প খাতের প্রতি সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রদান করেছে। তার মতে, সরকার শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, এবং নীতিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে শিল্পায়নের পথ সুগম করেছে। এই সহযোগিতা না থাকলে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হতো। আনিস উদ দৌলা বিশ্বাস করেন, সরকার ও শিল্প খাতের এই মেলবন্ধন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শিল্প উদ্যোক্তারা যখন সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, তখন তারা নতুন নতুন শিল্প স্থাপন এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা এবং বোঝাপড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং শিল্পায়নের গতি মসৃণ রাখার জন্য এই সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে, তিনি সরকারের স্থিতিশীল নীতিমালার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা তখনই নিরাপদ বোধ করেন যখন তারা দেখেন যে, সরকারের নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল। হঠাৎ করে নীতি পরিবর্তন হলে তা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং নতুন নতুন শিল্প খাতকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন অপরিহার্য। তিনি বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রণোদনা এবং সহজ ঋণ সুবিধা—এ ধরনের সরকারি উদ্যোগগুলোই বেসরকারি খাতকে এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশের কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
তার বক্তব্যে সমকালীন সময়ের পরিস্থিতিও উঠে আসে। উঠে আসে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা। বিশেষ করে ড. ইউনূসের বিষয়ে তার ধারণার কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে ড. ইউনূসের মতো দূরদর্শী ব্যক্তিদের অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্রঋণের ধারণা এবং এর সফল প্রয়োগ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিপ্লব এনেছে, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তাঁর মতে, ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিরা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার বীজ বুনে দিয়েছেন, যা এখন এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একই সাথে, তিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়ে তার ইতিবাচক মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজকের এই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পেছনে রয়েছে সুচিন্তিত নীতি প্রণয়ন এবং কার্যকর উদ্যোগ। তার মতে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জই ছিল অগ্রগতির সোপান। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, তিনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে একটি বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, যেখানে কেবল ব্যবসা নয়, বরং মানব উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক সূচকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক সূচকেও এর প্রভাব লক্ষণীয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত। আনিস উদ দৌলা বিশ্বাস করেন, এই সামাজিক উন্নয়নগুলোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন একটি দেশের মানুষ শিক্ষিত, সুস্থ এবং কর্মঠ হয়, তখন তারা আরও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে, যা অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এই মানবসম্পদকেই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে পেরেছে।
তার ভাবনার মূল সুরটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর আশাবাদে এসে মিলিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান উন্নয়ন ধারা সঠিক পথেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর গতি আরও বাড়বে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সৃজনশীল। সঠিক দিকনির্দেশনা এবং অনুকূল পরিবেশ পেলে এই মানুষগুলোই দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তার এই আশাবাদের পেছনে বেশ কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ, যাদেরকে তিনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন। জনসংখ্যার এই বোনাস বাংলাদেশকে আগামী কয়েক দশক ধরে একটি শক্তিশালী কর্মশক্তি সরবরাহ করবে, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় এক বিশাল সুবিধা। দ্বিতীয়ত, সরকারের ধারাবাহিক শিল্পবান্ধব নীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যা বিনিয়োগকে আকর্ষণ করছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের আগ্রহ। এই সবকটি উপাদানই একযোগে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে। আনিস উদ দৌলা বলেন, “আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাব।” তাঁর এই মন্তব্য শুধু একজন ব্যবসায়িক নেতার ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতি তাঁর গভীর আস্থার প্রতিফলন। তাঁর মতে, এই ইতিবাচক মনোভাব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে অদূর ভবিষ্যতে একটি উন্নত দেশে পরিণত করবে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত বিশ্ব বাজারে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত করবে। একই সাথে, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের বিকাশ দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়াতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁর মতে, এসব খাতকে যথাযথ নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সমর্থন করলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদ এড়িয়ে উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নিতে পারবে। এই আশাবাদ কোনো আবেগপ্রসূত নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর বাস্তব জ্ঞান ও দূরদর্শিতার প্রতিফলন। তার প্রতিটি কথা যেন এক একটি মাইলফলক, যা দেশের অতীত অর্জনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকে দেয়। তার এই সামগ্রিক ভাবনা কেবল একজন ব্যবসায়ীর নয়, বরং একজন জাতীয় চিন্তাবিদের, যিনি দেশের উন্নতিকে কেবল নিজের ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং দেখেছেন বৃহত্তর পরিসরে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Tag :
জনপ্রিয়

তারেক রহমান যেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারে, সে জন্য ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত

রাজু আলীম :

ড. ইউনূসকে আমি ব্লাইন্ডলি সাপোর্ট করি: এম আনিস উদ দৌলা

প্রকাশিত ০২:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে এম. আনিস উদ দৌলা কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং একজন চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে সমাদৃত। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, গভীর প্রজ্ঞা এবং দেশের প্রতি তার অবিচল বিশ্বাস তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সম্প্রতি তিনি দেশ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমকালীন প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন, কবি এবং সাংবাদিক রাজু আলীমের সাথে। এই সময়ের বিভিন্ন চিত্র তার আলোচনা ও বক্তব্যে প্রকাশ পায় তাঁর কথোপকথনে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, শিল্পের গতিপথ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়েও নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করেছেন তিনি। যা একত্রিত করলে একটি দেশের পথচলার সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। তার প্রতিটি কথার মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা নয়, বরং এক অবিচ্ছিন্ন অনুভূতির প্রবাহ।
বর্তমানের সমাজবাস্তবতায় তিনি দেশের ছাত্র আন্দোলন, পরিস্থিতি এবং তাঁর চোখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশের যে পরিবর্তন এসেছে, এটা এমন একটা পরিবর্তন যা পৃথিবীর কোথায় এসেছে বা কোথায় আসেনি তা আমি বলতে পারবো না। পরিবর্তনের এই সুযোগটা সবসময় আসে না। পরিবর্নের জন্য যে উদ্যম প্রয়োজন তা সবসময় আসে না। আমাদের জাতীয় জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের প্রতিটি নাগরীকের। দেশকে যার যেখানে যা যতটুকু সুযোগ আসে ততটুকুই কন্ট্রিবিউট করা উচিত।
কেউই বলতে পারবে না আমি একেবারে সাদা। সবাই গ্রে। যে সুযোগটা আমরা পেয়েছি সেই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগানো উচিত। ড. ইউনূসের মতো একজন বিজ্ঞ এবং বিশ্বব্যপী গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বাংলাদেশের ভার নিয়েছেন, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। তাকে আমাদের সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করা উচিত।
ছাত্ররা ছাত্রই। তারা পড়াশোনা করে, জ্ঞান অর্জন করে দেশের প্রতি যতটুকু সম্ভব সহায়তা করবে। রাজনীতি কোন বিজনেস তো না। পলিটিক্স হচ্ছে দেশ সেবা।
দেশের ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের বিষয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশের একটি অসাধারণ বিষয় যে ছাত্ররা দেশের ক্রান্তিকালে এগিয়ে আসে। দেশকে নিয়ে ভাবে। কিন্তু ছাত্ররা ছাত্র। ছাত্ররা এই পরিবর্তন আনতে পেরেছে কারণ তাদের কোন ভিন্ন স্বার্থ নেই। আমরা পেশাগত কাজে জড়িত। চাকরি অথবা পেশাগত জীবন আছে। পারিবারিক পিছুটান আছে। ছাত্রদের পিছুটান কম। সে কারণে দেশের জন্য তারা জীবন দিতে পারে। কিন্তু আমরা লুকিয়ে থাকি। পারিবারিক কারণে। আমাদের দেশের ছাত্ররা দেশকে কেনজানি এতই ভালোবাসে, তারা দেশের জন্য জীবন দিতে পারে।
আমাদের দেশে গুড গভর্নেন্স দরকার। আমাদের ছাত্ররা সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আমাদের সেই সুযোগটা সর্বাঙ্গীন ভাবে নেয়া উচিত। সহযোগীতা করা উচিত। তাকে বিশ্বাস করা উচিত। পলিটিকস যদি হয় আর্নিংয়ের একটি সুযোগ তবে দেশটা কোন দিকে যাবে। ড. ইউনূসকে আমি ব্লাইন্ডলি সাপোর্ট করি। হি ইস আ ম্যান উইথ নো ওয়েস্টার্ন ইন্টারেস্ট।
বর্তমানে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছেন তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা আমাদের সম্পদ। তারা অসাধারণ মানুষ। তারা দেশের এই দুর‌্যোগের মধ্যে ছাত্রদের আমন্ত্রনে দেশ গঠনে এসেছে। আমাদের তাদের সম্মান করা উচিত। এখন কি হচ্ছে বলার সময় না। এখন সময় তাদের সহায়তা করার। পরিবর্তনের ধারায় এগিয়ে যাবার চেষ্টা করা। দেশের ইন্টারেস্টে কাজ করা উচিত। ইউথ অনেস্টি। ভালো নিয়ত নিয়ে। কেবল বলার জন্য বলা না। সত্যিকার অর্থে সততা এবং সৎ নিয়ত নিয়ে সহায়তা করা।
দেশের সামগ্রীক ব্যবসায়িক নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দর্শন কোনো তাত্ত্বিক আদর্শ নয়, বরং তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অনুধাবন। তিনি মনে করেন, একটি শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে পারে না। মুনাফা অবশ্যই ব্যবসার প্রাণ, কিন্তু তা অর্জন করতে হবে সঠিক পথে চলে, যেখানে গ্রাহকের আস্থা, কর্মীদের কল্যাণ এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি একান্তে বলেন, “ব্যবসার একটি সঠিক পথ আছে, এবং সেই পথেই আমাদের চলতে হবে।” এই দর্শন এসিআই-এর মতো একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সাময়িক লোভের বানে গা না ভাসিয়ে সঠিক পথটি অনুসরণ করলে যেকোনো প্রতিকূলতা এড়ানো সম্ভব, এবং এটিই একটি প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন ব্যবসায়িক নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে দ্রুত লাভের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা প্রবল, তখন আনিস উদ দৌলার এই অবস্থান যেন এক স্থির বাতিঘর। তাঁর মতে, শর্টকাট বা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে সাময়িক সাফল্য হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু তা একটি জাতির অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি মূল্যবোধ তৈরি করা, যা কেবল আর্থিক সম্পদ নয়, বরং সমাজের কাছে বিশ্বাস ও সম্মান অর্জন করে। এসিআই তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে যে উদাহরণ স্থাপন করেছে, তা প্রমাণ করে যে মুনাফা এবং নৈতিকতা পরস্পর বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। কৃষি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে, তারা কেবল লাভজনকতার দিকেই মনোযোগ দেয় না, বরং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও আগ্রহী। তাঁর এই নীতিগত অবস্থান শুধু এসিআই-এর জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
তাঁর ভাবনায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার এবং বেসরকারি শিল্প খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও সহযোগী সম্পর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে কারণ সরকার বরাবরই শিল্প খাতের প্রতি সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রদান করেছে। তার মতে, সরকার শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, এবং নীতিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে শিল্পায়নের পথ সুগম করেছে। এই সহযোগিতা না থাকলে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হতো। আনিস উদ দৌলা বিশ্বাস করেন, সরকার ও শিল্প খাতের এই মেলবন্ধন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শিল্প উদ্যোক্তারা যখন সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, তখন তারা নতুন নতুন শিল্প স্থাপন এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা এবং বোঝাপড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং শিল্পায়নের গতি মসৃণ রাখার জন্য এই সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে, তিনি সরকারের স্থিতিশীল নীতিমালার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা তখনই নিরাপদ বোধ করেন যখন তারা দেখেন যে, সরকারের নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল। হঠাৎ করে নীতি পরিবর্তন হলে তা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং নতুন নতুন শিল্প খাতকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন অপরিহার্য। তিনি বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রণোদনা এবং সহজ ঋণ সুবিধা—এ ধরনের সরকারি উদ্যোগগুলোই বেসরকারি খাতকে এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশের কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
তার বক্তব্যে সমকালীন সময়ের পরিস্থিতিও উঠে আসে। উঠে আসে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা। বিশেষ করে ড. ইউনূসের বিষয়ে তার ধারণার কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে ড. ইউনূসের মতো দূরদর্শী ব্যক্তিদের অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্রঋণের ধারণা এবং এর সফল প্রয়োগ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিপ্লব এনেছে, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তাঁর মতে, ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিরা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার বীজ বুনে দিয়েছেন, যা এখন এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একই সাথে, তিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়ে তার ইতিবাচক মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজকের এই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পেছনে রয়েছে সুচিন্তিত নীতি প্রণয়ন এবং কার্যকর উদ্যোগ। তার মতে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জই ছিল অগ্রগতির সোপান। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, তিনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে একটি বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, যেখানে কেবল ব্যবসা নয়, বরং মানব উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক সূচকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক সূচকেও এর প্রভাব লক্ষণীয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত। আনিস উদ দৌলা বিশ্বাস করেন, এই সামাজিক উন্নয়নগুলোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন একটি দেশের মানুষ শিক্ষিত, সুস্থ এবং কর্মঠ হয়, তখন তারা আরও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে, যা অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এই মানবসম্পদকেই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে পেরেছে।
তার ভাবনার মূল সুরটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর আশাবাদে এসে মিলিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান উন্নয়ন ধারা সঠিক পথেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর গতি আরও বাড়বে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সৃজনশীল। সঠিক দিকনির্দেশনা এবং অনুকূল পরিবেশ পেলে এই মানুষগুলোই দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তার এই আশাবাদের পেছনে বেশ কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ, যাদেরকে তিনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন। জনসংখ্যার এই বোনাস বাংলাদেশকে আগামী কয়েক দশক ধরে একটি শক্তিশালী কর্মশক্তি সরবরাহ করবে, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় এক বিশাল সুবিধা। দ্বিতীয়ত, সরকারের ধারাবাহিক শিল্পবান্ধব নীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যা বিনিয়োগকে আকর্ষণ করছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের আগ্রহ। এই সবকটি উপাদানই একযোগে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে। আনিস উদ দৌলা বলেন, “আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাব।” তাঁর এই মন্তব্য শুধু একজন ব্যবসায়িক নেতার ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতি তাঁর গভীর আস্থার প্রতিফলন। তাঁর মতে, এই ইতিবাচক মনোভাব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে অদূর ভবিষ্যতে একটি উন্নত দেশে পরিণত করবে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত বিশ্ব বাজারে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত করবে। একই সাথে, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের বিকাশ দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়াতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁর মতে, এসব খাতকে যথাযথ নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সমর্থন করলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদ এড়িয়ে উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নিতে পারবে। এই আশাবাদ কোনো আবেগপ্রসূত নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর বাস্তব জ্ঞান ও দূরদর্শিতার প্রতিফলন। তার প্রতিটি কথা যেন এক একটি মাইলফলক, যা দেশের অতীত অর্জনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকে দেয়। তার এই সামগ্রিক ভাবনা কেবল একজন ব্যবসায়ীর নয়, বরং একজন জাতীয় চিন্তাবিদের, যিনি দেশের উন্নতিকে কেবল নিজের ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং দেখেছেন বৃহত্তর পরিসরে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব