অবনী অনিমেষ
দেশে চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশই নিম্নমানের চিনি অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে দেশের বাজারে অনুপ্রবেশ ঘটছে। এতে করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বছরে আনুমানিক তিন হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। রমজানে দেশে চিনির বাড়তি চাহিদা থাকায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার অন্তত ২৭টি চোরাইপথ দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারতের নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর ভেজাল চিনি দেশে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানেও এসব অবৈধ চিনি আসা ঠেকানো যাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর চিনি খাওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিরও আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত এসব অবৈধ চিনি যাতে দেশে না আসতে পারে, সেজন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সুনামগঞ্জের ছাতক থানার শান্তিগঞ্জে গত শনিবার চোরাই পথে আনা ভারতীয় ২৩৫ বস্তা চিনি উদ্ধার করেছে সুনামগঞ্জের হাইওয়ে পুলিশ। এ সময় চোরাকারবারিদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, কাভার্ডভ্যানে তল্লাশি করে ২৩৫ বস্তা ভারতীয় চিনিসহ ভ্যানটি জব্দ করা হয়। যার বাজারমূল্য ১৬ লাখ টাকার বেশি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-কাভার্ডভ্যান চালক ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার তেঘরীহুদা গ্রামের মোশারফ হোসেন, তাহিরপুর থানার লোহাজুড়ি ছড়ারপাড় গ্রামের বাছির মিয়া। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাইওয়ে থানার ওসি কবির আহমদের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে ভারতীয় চিনিসহ চোরাকারবারিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এর মাত্র দুইদিন আগে গত বৃহস্পতিবার সিলেটের বিশ্বনাথে প্রায় ছয় হাজার কেজি ভারতীয় চিনি ও একটি ট্রাকসহ পাঁচ চোরাকারবারিকে আটক করেছে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ। এদিন সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্বনাথ পৌর শহরে জানাইয়া গেটসংলগ্ন সড়ক থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকরা হলেন- সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর থানার মাঝাইর গ্রামের রমজান আলীর ছেলে জিয়াউর রহমান (৩৫), তাহিরপুর থানার বাদাঘাট সোহালা গ্রামের মো. ফারুক মিয়ার ছেলে আসাদুর রহমান (২৮), একই গ্রামের সেলিম রেজার ছেলে ফাহিম রেজা (২৫), মো. রইছ মিয়ার ছেলে এস এম তুষার আহমদ রাজ (২৪), জামালগঞ্জ থানার শরীফপুর গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে নবী হোসেন (৩৫)। এ ব্যাপরে বিশ্বনাথ পুলিশ স্টেশনের অফিসার ইনচার্জ রমা প্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ১২০ বস্তা (প্রায় ছয় হাজার কেজি) চিনিসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে।
শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ ও সিলেট নয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার অন্তত ২৭টি চোরাই পথ দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারতের নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর ভেজাল চিনি দেশে আসছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিনই অবৈধভাবে দেশের জনগণের চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশই নিম্নমানের চিনি অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে দেশের বাজারে অনুপ্রবেশ ঘটছে। এর প্রভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বছরে আনুমানিক তিন হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
জানা গেছে, পবিত্র মাহে রমজান মাসজুড়ে চিনির ব্যাপক চাহিদা থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের চিনি কমদামে বাজারজাত করে আসছে। এই চিনিগুলো মূলত আসে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে তাও আবার চোরাই পথে। অসাধু ব্যবসায়ীরা দেশি ব্র্যান্ড ফ্রেশ, দেশবন্ধু, তীর, এস আলমসহ বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের নাম এবং বস্তা ব্যবহার করছে। এসব নিম্নমানের চিনি জালিয়াতি করে ব্র্যান্ডের চিনির বস্তায় ঢুকিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে প্রথমত ঐসব ব্র্যান্ড আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ও ব্র্যান্ড ইমেজ নষ্ট হচ্ছে, দ্বিতীয়ত এসব চিনি খাওয়ার পরে মানুষের মাঝে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে আসা চিনির মান নিয়ন্ত্রেণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ভোক্তা সাধারণ এই নিম্নমানের কমদামের চিনি গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। এসব নিম্নমানের চিনি মানব শরীরে নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে। এ ভেজাল চিনি বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনকি এসব চিনি খাদ্যে মিশিয়ে ব্যবহার করা হলে কিডনি আক্রান্ত ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদরোগের ঝুঁকি এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারা জানান, দেশের আপামর জনসাধারণের কথা বিবেচনা করে বাজার থেকে এসব নিম্নমানের চোরাই চিনি অতিশীঘ্রই অপসারণ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
জানা গেছে, দেশের সাধারণ ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে দেশীয় চিনি কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভালো এবং গুণগতমানসম্পন্ন চিনি দেশে বাজারজাত করে আসছে। এই রমজানেও তার ব্যতিক্রম নেই। দেশে রোজা ও কোরবানির ঈদসহ সারা বছরে চিনির চাহিদা আনুমানিক ২৪ লাখ টন। বেসরকারি বৃহৎ চিনির মিলের সংখ্যা পাঁচটি। যার আনুমানিক উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ১৫ হাজার টন। সারাদেশে দৈনিক চাহিদা সাড়ে ছয় হাজার টনের বেশি নয়। অর্থাৎ আমাদের দেশের মিলগুলোতে চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। অথচ প্রতিদিনই অবৈধভাবে দেশের জনগণের চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ নিম্নমানের চিনি অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে দেশের বাজারে অনুপ্রবেশ ঘটছে; যা অতিশীঘ্রই বন্ধের দাবি জানিয়েছেন দেশের চিনি শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে চোরাই পথে আসা চিনি স্থানীয়ভাবে ‘বুঙ্গার চিনি’ নামে পরিচিত। চোরাচালানে আসা এসব চিনিতে সিলেটের বাজার এখন সয়লাব। পুলিশ প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে চিনি চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চিনি উদ্ধার করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে মূল হোতারা।
গত কয়েকমাসে চোরাইপথে দেশে আসা চিনি উদ্ধারের তথ্য নিয়ে প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন-
শেরপুর:২১ মার্চ বৃহস্পতিবার পৌর শহরের আড়াইআনী কালেমা চত্বর মোড়ে হালুয়াঘাটের বাঘাইতলা থেকে আসা এসব চিনি ও যানবাহনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়।বৃহস্পতিবার ভোরে বাঘাইতলা বাজারের চোরাকারবারি ব্যবসায়ী হারুন মিয়া চোরাই পথে আনা তার মালিকানাধীন ৫০ কেজি করে ৪৪০ বস্তা ভারতীয় চিনি একটি ট্রাক ও একটি পিকআপে করে পাচার করছিল।
এসময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নালিতাবাড়ী থানা পুলিশের একটি দল এসআই আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে শহরের আড়াইআনী বাজার কালেমা চত্বরে অবস্থান নেয়। ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে কালেমা চত্বর অতিক্রম করার সময় ট্রাক ও পিকআপ আটকে তল্লাসীকালে ভারতীয় ওইসব চিনির বস্তা পাওয়া যায়। পরে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ট্রাক ও পিকআপসহ চিনি জব্দ করা হয়। অভিযান এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ মে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে এক হাজার ২৯২ বস্তা ভারতীয় চোরাই চিনি উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় রুহুল আমিন (৪৬) নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ মে) রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত রুহুল আমিনের বাড়ি ও গুদামসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা এসব চিনি জব্দ করা হয়। গ্রেফতার রুহুল আমিন নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের বরুয়াজানি এলাকার শের আলীর ছেলে। তিনি পেশায় একজন মুদি দোকানি, কাকরকান্দি বাজারে তার দোকান ও গুদাম রয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারকের আদেশে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, নালিতাবাড়ীর বিভিন্ন সীমান্তবর্তী রুটে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় চোরাই চিনি বাংলাদেশে ঢুকছে- এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে ডিবি ও নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ। পরে চিনি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিনের বাড়ি ও উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় থাকা গোডাউন থেকে মোট এক হাজার ২৯২ বস্তা চোরাই চিনি উদ্ধার করা হয়। সেই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় তাকে।
উদ্ধার করা চিনির পরিমাণ প্রায় ৬২ টন ও এগুলোর বাজার মূল্য প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. আকরামুল হোসেন বলেন, এই চোরাচালানের সঙ্গে আরও কয়েকজন সম্পৃক্ত রয়েছেন। গ্রেফতার রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আশা করছি, তার মাধ্যমে আরও তথ্য পাবো।
তিনি আরও বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি, শেরপুরের সীমান্ত গলিয়ে চিনিগুলো আসছে না। সেগুলো আসছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তের চোরাপথে। তবে শেরপুরকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখানে ‘স্টোর প্লেস’ (মজুত স্থান) হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা সেটি প্রতিরোধেও কাজ করছি।
নালিতাবাড়ী থানার ওসি মনিরুল আলম ভূঁইয়া জানান, এ ঘটনায় থানায় ডিবির করা একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রেফতার রুহুল আমিনকে মঙ্গলবার বিকালে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার: গত ৭ মার্চ কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর ইউনিয়নের চোরাইভাবে আসা ২৯০ বস্তা ভারতীয় চিনি জব্দ করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অভিযানে অবৈধভাবে আমদানি করা ৫০ কেজির ২৯০ বস্তা ভারতীয় চিনি জব্দ করলেও পাচারে ব্যবহৃত দুটি ট্রাক আটক করা যায়নি। এ সময় চিনির গোডাউন সিলগালা করা হয়। শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (তদন্ত) শামীম আকনজী জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি ভারতীয় কোম্পানির ২৯০ বস্তায় মোট ১৪ হাজার ৫০০ কেজি চিনি জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৯ লাখ টাকা। স্থানীয়রা জানান, চিনি পাচারকারী এই চক্রের কয়েকজন মিলে দীর্ঘ দিন ধরে ভারত থেকে চোরাই পথে কম দামে ভারতীয় চিনি এনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছিল। প্রশাসনের চোখের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ: দিনে দিনে চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার সকল চোরাই পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ভারতীয় চিনি, পেঁয়াজ, কসমেটিক্স, প্রশাধনী, পোশাক, ফলমূল ও গবাদিপশু। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নিরাপদে চোরাই পণ্য দেশে প্রবেশ করানো হয়। তাদের সহযোগিতায় রয়েছে আরেকটি চক্র। তারা নিজেদের পুলিশ এবং সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। প্রতিদিন কয় হাজার বস্তা চিনি বা পেঁয়াজ বের হয় এসব রুটে তার হিসাব অনুযায়ী হয় দর কষাকষি। এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ্ বলেন, সুনামগঞ্জে আমরা বড় বড় চালান জব্দ করেছি। এসব কাজে সীমান্তের গুটিকয়েক লোক জড়িত রয়েছে। চোরাচালান বন্ধে আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে আঞ্চলিক সড়কে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। চোরাচালানের সাথে কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট: সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে বেপরোয়াভাবে চোরাকারবারিরা অবৈধভাবে ভারত থেকে প্রতিদিন শত শত বস্তা চিনি নিয়ে আসছে। বেপরোয়া চোরাচালান নিয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও থেমে নেই চোরাকারবারিরা। বিশেষ করে দেশে চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় কয়েকশ চোরাকারবারি ভারতীয় চিনি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তারা প্রতিদিন কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী সুরইঘাট, লোভাছড়া, মুলাগুল বড়গ্রাম, মঙ্গলপুর, সোনারখেওড়, দনা, কাড়াবাল্লা, বড়বন্দসহ আরো কয়েকটি স্পট দিয়ে হাজার হাজার বস্তা চিনি ভারত থেকে অবৈধভাবে দেশে এনে প্রকাশ্যে লোভা-সুরমা নদীর নৌপথে ও বিভিন্ন সড়ক দিয়ে কানাইঘাটের হাটবাজারসহ বাসাবাড়িতে মজুত করে রাখে। পরে তা দেশীয় বিভিন্ন চিনি কোম্পানির বস্তা পরিবর্তন করে বড় বড় কনটেইনার ও ট্রাকে করে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যে বিজিবি, র্যাব, ডিবি পুলিশ ভারতীয় চিনির ছোট-বড় চালান আটক করলেও থেমে নেই চোরাকারবারিরা। চিনির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে শক্তিশালী চোরাকারবারি চক্র, রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাকর্মী, কিছু জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ীসহ আরো অনেকে জড়িয়ে পড়েছে এ ব্যবসার সঙ্গে। উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে চিনিসহ উল্লিখিত মাদকদ্রব্য ও ভারতীয় পণ্যসামগ্রী দেশে এনে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে চোরাকারবারিরা।
নেত্রকোনা: নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর সীমান্ত পার হয়ে অবৈধভাবে আসছে ভারতীয় চিনি। প্রায়ই জেলা পুলিশের অভিযানে জেলার বিভিন্ন সড়কে জব্দ করা হয় ভারতীয় চিনি। চোরাকারবারিরা এ দুই উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত পথ দিয়ে চিনি এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সীমান্ত চোরাচালান দ্বন্দ্বে গত এক বছরে একজন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকসহ পাঁচটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর চোরাকারবারিদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলার দুর্গাপুরে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৪৭৫ কেজি (৫৫ বস্তা) ভারতীয় চিনিসহ একজন চোরাচালানিকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় চোরাচালান কাজে ব্যবহারের একটি কার্গো ট্রাক জব্দ করা হয়। উপজেলার ঝানজাইল এলাকা থেকে এসব চিনি আটক করা হয়। আটক চোরাচালানি মো. ওবায়দুল্লা হক নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার কাদিগাটা গ্রামের বাসিন্দা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ পথে আসছে চিনি। সেসব চিনি ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয়সহ জেলা-উপজেলার বিভিন্ন বাজারে। এ কারণে অবৈধভাবে আসায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অন্যদিকে দেশের চিনি শিল্পে ঘটছে ব্যাপক ক্ষতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেটি অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে দেশের বাজারের তুলনায় দাম কমে পাওয়ায় এ চিনির কারবার বেড়েই চলেছে এবং স্থানীয় বাজারসহ জেলার অধিকাংশ বাজারে ওই চিনিতে সয়লাব হয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। স্থানীরা বলছে, উপজেলার গোপীনাথপুর ও বায়েক ইউনিয়নের সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আনা হচ্ছে ভারতীয় চিনি। বায়েক ইউনিয়নের গোরাঙ্গলা, পুঠিয়া, খাদলা, মাদলা, শ্যামপুর, কুল্লাপাথর এবং গোপীনাথপুর সীমান্তের ধ্বজ নগর, মুতিনগর, কাজিয়াতলী, বাগানবাড়ি, পাথারিয়া দ্বার ও লতুয়ামুড়া এলাকা দিয়ে অবৈধ পথে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চিনি দেশে প্রবেশ করে। এক শ্রেণির চোরাকারবারি সীমান্ত এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষদের চিনি চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করেন। কাটা তারের বেড়া পার করে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের পাশাপাশি, রাতে পিকআপ ভ্যানে করে এসব চিনি ছড়িয়ে যায় জেলার বিভিন্ন বাজারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, বায়েক ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকার শতাধিক মানুষ চিনি চোরাচালান ও পাচারে জড়িত। প্রতিদিন প্রায় ৩০-৪০ টন চিনি পাচার হয়ে দেশে আসছে। দেশের বাজারের তুলনায় ভারতে চিনির দাম কম হওয়ায় চোরাকারবারিরা সুযোগ নেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কসবায় অবৈধপথে আনা চিনি উদ্ধারসহ ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই কাজ করছে পুলিশ। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ চিনি উদ্ধারসহ চোরাকারবারি আটক হয়েছে। অবৈধ পথে আসা পণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেও কাজ করছে পুলিশ।’
কুমিল্লা: কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় অবৈধ পথে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের চিনি আসছে ভারতীয় সিমান্তবর্তী এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা এবং কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নয়নপুর এলাকা দিয়ে। সেসব চিনি মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ বাজার ও বাঙ্গরা বাজার এলাকা থেকে বিক্রি হচ্ছে পার্শবর্তী উপজেলা দেবিদ্বার, তিতাস, মেঘনা, হোমনা, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুরের বিভিন্ন বাজারে। সূূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা সদরের প্রয়াত হাজী শুক্কুর আলীর ছোট ছেলে জামাল বাহিনীর ১৭ সদস্যবিশিষ্টি একটি চোরাকারবারি চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে এসব চিনি ক্রয়-বিক্রয়। চক্রটি প্রতিদিন কমপক্ষে শতাধিক পিকআপে করে অবৈধ পথে নিয়ে আসা এসব ভারতীয় চিনি বিক্রয় করছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। অন্যদিকে দেশের বাজারের তুলনায় দাম কমে পাওয়ায় এ চিনির কারবার বেড়েই চলেছে এবং স্থানীয় বাজারসহ জেলার অধিকাংশ বাজারে ওই চিনিতে সয়লাব হয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা বলছে, এতে এক শ্রেণির মানুষ লাভবান হলেও দেশীয় চিনিশিল্প হুমকির মুখে পড়ছে। সেইসঙ্গে দ্রুত এই চোরাচালান বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।