সনাতনী ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক চন্ডীতীর্থ খ্যাত অন্যতম আধ্যাত্মিক লীলাভূমি মেধস মুনির আশ্রম।অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নয়নাবিরাম শান্ত, স্নিগ্ধ, মায়াময় পরিবেশ মন্দিরটি অবস্থিত। যেকোনো তীর্থযাত্রী কিংবা ভ্রমণ পিপাসুদের অতি সহজেই মুগ্ধ করে। সু দীর্ঘ সময় পর এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকায় নিবন্ধিত ও অন্তর্ভুক্ত হয়। নিবন্ধনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রামের দায়িত্বরত হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি “দীপক কুমার পালিত” এবং নবগঠিত কমিটি। দীর্ঘ সময় পর এমন মহৎ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অনুমোদনের বিষয়টি সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রশংসনীয় আর আনন্দদায়ক ও বটে। এটি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নে পাহাড়ের উপর অবস্থিত।
কিভাবে যাওয়া যায়:-
চট্টগ্রাম বহদ্দরহাট বা বাস টার্মিনাল হতে বাসযোগে অথবা সিএনজি ট্যাক্সিযোগে সরাসরি বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদ নামতে হবে। এরপর কানুনগোপাড়া কালাইয়ার হাট এর বাম পাশ দিয়ে কিছুদূর অতিক্রমের পর করলডেঙ্গা পাহাড়ের চুড়ায় মেধসমুনি আশ্রম পেয়ে যাবেন।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
কালিক পুরাণ ও কামাক্ষ্যা পুরাণের কিংবদন্তী মতে, সত্য যুগে রাজা সুরথ ঋষি মেধসের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর বসন্তকালে মেধসমুনি আশ্রমে প্রথম দুর্গা পূজা করেছিলেন। স্বামী বেদানন্দ মহাত্মাই ১৯০০ সালে যোগবলে জ্ঞাত হয়ে এ পুণ্যতীর্থ উদ্ধার করেন। আশ্রম পুনরুদ্ধারের পর থেকেই মেধসমুনি আশ্রমকে ভক্তদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আশ্রমটি আবারো ধ্বংস হয়ে যায়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সমগ্র জায়গাটিকে ছাইয়ের স্তূপে পরিণত করে ও ছয় ফুট লম্বা দেবমূর্তি ধ্বংস করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই পবিত্র আশ্রমের যত্ন নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। ভক্ত, সাধু ও পণ্ডিতদের সমন্বয়ে আশ্রম কমিটি পুনর্গঠিত হয়। আশ্রমের পেছনে কমিটির সময় ব্যয় ও সমর্পণের জন্য আশ্রম আবারও তার অতীত মহিমা পুনরুদ্ধার করেছে।
মন্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাঃ
আশ্রমে চণ্ডী মন্দির, শিব মন্দির, সীতা মন্দির, তারা কালী মন্দিরসহ ১০টি মন্দির রয়েছে। আশ্রমের প্রধান ফটক দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার গেলে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। প্রায় ১৪০টি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে মেধস মুনির মন্দির চোখে পড়বে। এই মন্দিরের পরই দেবী চণ্ডীর মূল মন্দির অবস্থিত। এর একপাশে রয়েছে সীতার পুকুর, পেছনে রয়েছে ঝরনা। মন্দিরের পেছনে সাধু সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য রয়েছে দোতলা ভবন। প্রায় ৬৯ একর জায়গাজুড়ে স্থাপিত হয়েছে এই মন্দির। প্রতি বছর মহালয়ার মাধ্যমে দেবী পক্ষের সূচনা হয় এই মন্দিরে।বোয়ালখালীর মেধসমুনি আশ্রম উদ্ভাবনী থিমের পুজা মণ্ডপের জন্য বিখ্যাত নয়। এটি অনন্য এর পুরোনো ইতিহাসের জন্য। আশ্রমটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ও শিল্প উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে দূরে গড়ে উঠেছে, যেখানে দর্শনার্থীরা ভেতরকার শান্তি খুঁজে নেয়ার সুযোগ পায়।
আশ্রম গেটের কিছুটা আগে রাস্তার বামে রয়েছে একটি পদ্মপুকুর, সাথে বিশ্রামাগার। এই এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০০,০০০ গাছপালার আবাস, যার মধ্যে রয়েছে মেহগনি, সেগুন, রেইন ট্রি, শিউলি, হাসনাহেনা, করবী, কৃষ্ণচূড়া, কনকচূড়া, বাঁশগাছ, কলাগাছসহ প্রভৃতি উদ্ভিদ। আশ্রমের লোকেরা কয়েক দশক ধরে এদের প্রতিপালন করেছে। প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠার পর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব। পাহাড়ের উপরে সবকিছুই নীরব, কেবল পাখির কূজন ও সরীসৃপদের আবাসস্থলের চারদিকে আবর্তনের শব্দের পাশাপাশি ভক্তিমূলক ভজন ও পূজার সময় ব্যবহৃত পিতলের ঘণ্টার টুংটাং শব্দ শোনা যায়। সারি সারি পাহাড়, পাহাড়ের মাঝে জুমচাষ, দূরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচে ঝাপসা প্রকৃতির দৃশ্য, ঠাণ্ডা হাওয়া- এসবকিছু উপভোগ করে ভালো লাগার মতো সময় এখানে কাটানো যায়।