গতকাল দিনমান কলমাকান্দা ভ্রমণ আমাকে পরিব্রাজকের ভালোলাগা দিয়েছে। নতুন করে নয় কেবল, পুরনো আশাবাদ আবারও জাগিয়ে তুলেছে বাংলাদেশের সীমান্তরেখার এই অঞ্চল কলমাকান্দাকে ঘিরে। কথা বলেছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা Uno Kalmakanda ফাইযুল ওয়াসীমা নাহাত-এর সাথে। তিনি একজন আন্তরিক কর্মকর্তার ন্যায় কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই তিনি দায়িত্বশীলতা নিয়ে কাজ করছেন বলে বিশ্বাস করি। সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গের সাথেও কথা বলেছি। সেইসাথে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস Banani Biswas মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাখছি- তার কর্মদায়িত্বের জেলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনে নানা উন্নয়ন চিন্তার আলোকভাবনা পর্যবেক্ষণ করে, সবার কাছ থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করতে পারেন অঞ্চলভিত্তিক জনমানুষের প্রত্যাশা;প্রয়োজনে উন্নয়ন পরামর্শ।
উল্লেখ্য, জেলার উন্নয়নে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য উপজেলাগুলোও কমবেশি একইরকম সম্ভাবনাময়। একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা যখন উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে, তখন সেখানকার প্রতিটি নদী, পাহাড়, হাওর এবং মানুষ নতুন অর্থ বহন করে। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দা, এমনই এক জনপদ- যার উন্নয়ন শুধু স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ এক অনুচ্ছেদ হয়ে উঠতে পারে।
লোকালাইজেশনের পথেই উন্নয়নের গতিপথ
বৈশ্বিক উন্নয়ন ভাবনায় বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত যে ধারণাটি হচ্ছে, তা হলো ‘লোকালাইজেশন অব ডেভেলপমেন্ট’।
সহজভাবে বললে, স্থানীয় চাহিদা, সম্পদ, মানবশক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নই এই প্রক্রিয়ার মূল কথা। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) অর্জনে এই নীতির গুরুত্ব অপরিসীম। কলমাকান্দা বাংলাদেশের সীমান্তে থেকেও কেন্দ্রের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়- সেই লোকালাইজড উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
এক. কলমাকান্দার পরিচয় ও ভৌগোলিক প্রসঙ্গঃ
নেত্রকোনা জেলার উত্তরে অবস্থিত কলমাকান্দা, উপজেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, আর পূর্বে ও দক্ষিণে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। এর ভূপ্রকৃতি অনন্য- উঁচু-নিচু পাহাড়, ঢেউখেলা নদী, বর্ষায় ভরে ওঠা হাওর, আর সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখানকার মূল নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে- সোমেশ্বরী,উব্ধাখালী, ধনু। এছাড়া আরও আছে পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ছড়া;বর্ষায় এগুলোতে পানি প্রবাহিত হয়। পাহাড় ও নদী মিলে এই অঞ্চল একদিকে যেমন পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয়, অন্যদিকে কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমানা বাণিজ্যের সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
দুই . লোকালাইজড উন্নয়নের পাঁচটি প্রধান খাতঃ কলমাকান্দার আলোকবর্তিকা-
(ক) শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
এই উপজেলায় মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার অভাব প্রকট। তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
(খ) কৃষি ও জলাভিত্তিক উৎপাদন
হাওর ও নদীনির্ভর কলমাকান্দা বর্ষাকালে যেমন মাছের ভান্ডার, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে হয়ে ওঠে ধান ও সবজিচাষের মাঠ। যদি আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, তাহলে এই খাতটি বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
(গ) পর্যটন ও সংস্কৃতি
সীমান্তবর্তী পাহাড়ি সৌন্দর্য এবং মেঘালয়ের দৃশ্য, সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, আদিবাসী সংস্কৃতি- এই সব মিলিয়ে কলমাকান্দা একটি সম্ভাব্য ‘ইকো-ট্যুরিজম জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। ছোট ছোট কটেজ, গ্রামীণ সংস্কৃতি কেন্দ্র, লোকশিল্প মেলা এবং স্থানীয় হস্তশিল্প বিকাশের মাধ্যমে এক নতুন পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।
(ঘ) সীমান্ত বাণিজ্য ও অবকাঠামো
ভারতের সঙ্গে সুসজ্জিত সীমান্ত হাট, নিরাপদ ও উন্নত সড়কব্যবস্থা, সীমান্ত পারাপার অবকাঠামো তৈরি করলে এ অঞ্চলে সীমানাবাণিজ্য উন্নয়নের বড় ক্ষেত্র খুলে যাবে। এতে করে স্থানীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন।
(ঙ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ
প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এই অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার আগাম সতর্কতা, দুর্যোগ সহনশীল বাসগৃহ, নদী খনন ও হাওর ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও পাহাড় সংরক্ষণ কর্মসূচি জরুরি।
তিন. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে কলমাকান্দার ভূমিকা
SDG 1 ও 2:
দারিদ্র্য হ্রাস ও ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠনে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
SDG 4:
মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে ICT নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উপযোগী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দরকার।
SDG 8 ও 9:
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশ, টেকসই অবকাঠামো ও পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে।
SDG 13 ও 15:
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, হাওর ও পাহাড় সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা- এই সকল বিষয়ে স্থানীয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
চার. পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ চিত্র: ‘আমার কলমাকান্দা, সম্ভাবনার জনপদ’
একটি সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন পরিকল্পনায় চাইঃ
‘People-Centered Development Model’ -যেখানে জনগণই হবে পরিকল্পনা প্রণয়নের মূল অংশীদার।
‘Participatory Budgeting’- স্থানীয় সরকারে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে বরাদ্দ নির্ধারণ।
‘Digital Connectivity and Smart Services’- প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ই-গভর্নেন্স চালু করে সেবা সহজীকরণ।
‘Green Growth’- প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে পরিবেশবান্ধব কৃষি, পর্যটন ও শিল্পায়ন।
পাঁচ. সীমান্ত নয়, সামনের দরোজা
কলমাকান্দা আর পিছিয়ে থাকা উপজেলা নয়। এটি এক সম্ভাবনাময় সীমান্তদ্বার, যা বিশ্বব্যাপী আলোচিত ‘গ্লোবাল থিংকিং, লোকাল অ্যাকশন’ দর্শনের বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র হতে পারে। উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক নয়, শুধু ভবন নয়- মানুষের ক্ষমতায়ন, প্রকৃতির সম্মান, সংস্কৃতির জাগরণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা- এই চেতনায় কলমাকান্দার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যদি এই ভূমিকে শুধু সীমান্ত না ভেবে সম্ভাবনার প্রান্তর হিসেবে দেখি, তাহলে উন্নয়নও একদিন দাঁড়িয়ে যাবে পাহাড়ের মাথায়, হাওরের জলে প্রতিফলিত হয়ে- তাহলে কলমাকান্দা হয়ে উঠবে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।