সেই টিকাটুলির অভয় দাস লেনে ছিল বনেদি ব্যবসায়ী সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর এক সুরম্য বাড়ি, নাম ‘তারাবাগ’।
ওই বাড়িতেই ১৯৫৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা।
মায়ের নাম সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা।
এই রোকসানাই জীবনে অনেক চড়াই–উতরাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট।
কানিজ ফাতেমা রোকসানার ডাকনাম ‘তিতলী’। তিতলী অর্থ ‘প্রজাপতি’।
বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই।
আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রোকসানা ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তি হন।
কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুই বছরের মাথায় ১৯৭৮ সালে পেয়ে যান কমার্শিয়াল বিমান চালানোর লাইসেন্স।
তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে দুই বছরের মাথায় ফ্লাইং ক্লাবে ‘ইনস্ট্রাক্টর’–এর দায়িত্ব পান।
ফ্লাইং ক্লাবে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল, যে করেই হোক বিমানে পাইলট হিসেবে ঢোকা।
একদিন ১৯৭৮ সালের ১৯ নভেম্বর ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ বিমান।
৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় রোকসানা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
তবে নারী হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাঁর নিয়োগ আটকে দেয়।
১৯৭৯ সালের ২৫ মে ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ বিমান আরেকটি বিজ্ঞপ্তি দেয়।
সেখানে বলা হয়, শুধু পুরুষ প্রার্থীরাই আবেদন করতে পারবে।
অর্থাৎ নারীরা আবেদনই করতে পারবে না। সেই ঘটনা তাঁকে প্রতিবাদী করে তোলে।
যোগ্যতা সত্ত্বেও নিয়োগ না পাওয়া এবং বিজ্ঞপ্তিতে নারীদের পাইলট হিসেবে আবেদনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করে রোকসানা ১৯৭৯ সালের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকে চিঠি লিখেন।
শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ বিমান বনাম মহিলা বৈমানিক’।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সংসদের নারী সদস্যদের উদ্দেশে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে বিমানের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যে নারী–পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, সেটি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রোকসানার সেই চিঠি ইত্তেফাকে ছাপা হওয়ার পর সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। উত্তপ্ত আলোচনা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। নারী সংসদ সদস্য, অধিকারকর্মী, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ প্রগতিশীল মানুষেরা তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন।
অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের বিজ্ঞপ্তিতে ‘লিঙ্গবৈষম্যের’ শর্ত তুলে নিতে বাধ্য হয়।
পরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগ পান।
পাইলট রোকসানার নীল আকাশে ডানা মেলে ওড়া বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
তিনি ক্যাডেট পাইলট থেকে প্রমোশন পেয়ে ফার্স্ট অফিসার হন।
এরপর অপেক্ষায় ছিলেন ক্যাপ্টেন হওয়ার।
দেখতে দেখতে চলে যায় ৪ বছর ৮ মাসের মতো।
এরই মাঝে ঘটে হৃদয়বিদারক বিমান দুর্ঘটনা।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ফকার–২৭ বিমানে করে ঢাকায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পড়েন।
ওই দিন বিমানের মূল পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন কায়েস আহমদ মজুমদার এবং কো–পাইলট ছিলেন ফার্স্ট অফিসার কানিজ ফাতেমা রোকসানা।
তীব্র বাতাসের কারণে তাঁরা রানওয়েতে দুই দফা ল্যান্ড করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
তৃতীয় দফায় অবতরণের জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারের কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পরই বিমানটির সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের বেতার সংযোগ পুরোপুরি ‘বিচ্ছিন্ন’ হয়ে যায়।
এ কারণে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটের দিকে কুয়াশার মধ্যে ওপর থেকে বাউনিয়া বিলকে ‘রানওয়ে’ মনে করে ল্যান্ড করতে গিয়ে ‘মিস জাজমেন্ট’ হয়।
বিধ্বস্ত হয়ে বিমানটি ২০ থেকে ২৫ ফুট পানির নিচে ডুবে যায়।
ওই দুর্ঘটনায় ৪৪ জন যাত্রীসহ দুই পাইলট, তিন ক্রুসহ ৪৯ জনের সবার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের ভেতরে এখন পর্যন্ত সেটিই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা।
বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) শেখ নাসির উদ্দীন আহমেদ।
১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি ফ্লাইট অফিসার কানিজ ফাতেমা রোকসানার সহকর্মী ছিলেন।
শেখ নাসির বলেন, ‘আমার জানা মতে, পাকিস্তান ও তুরস্কের মেয়েরা আমাদের মেয়েদের পরে বৈমানিক হয়েছেন। তবে ভারতে দুর্বা ব্যানার্জি বাংলাদেশের মেয়েদের আগে পাইলটের খাতায় নাম লিখেছিলেন।’
বিমান চালানোর প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা পাইলট সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানার জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে বিমানের মধ্যেই।
অদম্য সাহসী সেই নারী শুধু নিজেই ডানা মেলে আকাশে ওড়েননি, তাঁকে দেখে উড়তে শিখেছেন পরবর্তী প্রজন্মের সাহসী মেয়েরাও।