যুবসমাজ, শিক্ষার্থী, উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণিরা বেশি আসক্ত অনলাইন জুয়া এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গেমস এ। নষ্ট হচ্ছে লেখাপড়া। বাড়ছে পারিবারিক কলহ। ঘটছে না নানা দুর্ঘটনা। কিশোর-কিশোরীদের এনড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনাও দেশে কম ঘটেনি। যাহোক, অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা পৌঁছে গেছে ইটপাথরে গড়া শহর থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচে-কানাচে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে, সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে প্রযুক্তির। এমন সর্বনাশা নেশায় সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন অনেকে। অনলাইন জুয়াচক্রের সদস্যরা মাসে লেনদেন করছে কোটি কোটি টাকা। আর এ টাকা চলে যাচ্ছে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে বিদেশিচক্রের হাতে। বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা এ নেশায় আসক্ত। জুয়ার আড্ডা। সন্ধ্যা রাত থেকে শুরু করে পাড়ার দোকান পাটে বসে চলে গভীর রাত পর্যন্ত এ আড্ডা। চলে পাপজি, ফ্রি ফায়ার গেম খেলা। শুধু তাই নয়, ডিজিটাল যুগে গ্রামেও রয়েছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা, রয়েছে ওয়াইফাই সংযোগ। ঘরে বসেও চলছে জুয়ার আড্ডা। আবার পূর্ব পদ্ধতি তাশের মাধ্যমেও চলে এ আড্ডা। জুয়ার টাকার যোগান দিতে অনেকেই আবার জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। বাড়ছে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাং এর প্রতিযোগিতা।লোকচক্ষুর আড়ালে জুয়ার আসর বসতো একটা সময়। এখন তথ্য প্রযুক্তির হাত ধরে বদলে গেছে সে চিত্র। কিন্তু বিপদ কমেনি বরং কয়েকগুণ বেড়েছে। কারণ মোবাইলে কিংবা কম্পিউটার-ল্যাপটপে বসেই এখন দেশে-বিদেশে ট্রেডিংয়ের নামে চলছে অনলাইন জুয়া। বিদেশ থেকে পরিচালিত এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপস শহর-নগর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। যার বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বিদেশ থেকে এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপস পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব সাইট বা অ্যাপস ভার্চুয়ালি জুয়া খেলায় অল্প টাকা বিনিয়োগে বেশি টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে। আর এভাবেই প্রতিদিন অনলাইন জুয়া খেলায় দেড় থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে। যার পরিমাণ বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। এরই মধ্যে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ানসহ (র্যাব) বিভিন্ন ইউনিট অনলাইন জুয়া চক্রের অনেক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়েও দমানো যাচ্ছে না এই চক্রকে।প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, সঠিক নজরদারি না থাকায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিদিনই কোটি টাকা পাচার হচ্ছে দেশের বাহিরে। এতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বিপথে যাচ্ছেন তরুণ ও যুবকরা। তাই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এক্ষেত্রে সঠিক নজরদারি রাখতে হবে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইনে জুয়া খেলা পরিচালনার জন্য বেট ৩৬৫ ডটকম, প্লেবেট ৩৬৫ ডটকম, বিডিটি ১০ ডটকম, উইনস ৬৫ ডটকম ও বেটস্কোর ২৪ ডটকমসহ অন্তত এরকম অর্ধশতাধিক বেটিং সাইট চালু রয়েছে দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। এসব অনলাইন জুয়ার সাইটের তথ্য পেয়ে বিটিআরসি মাঝে মধ্যেই তা বন্ধ করে দিলেও বিকল্প ডোমেইনে ফের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সাইটগুলো। আবার বিটিআরসি থেকে ব্লক করা সাইটে জুয়া খেলতে ভিপিএনের সাহায্যও নিচ্ছে ব্যবহারকারীরা। শুধু তাই নয় কোনো কোনো জুয়ার সাইট অ্যাপস হিসেবে প্লে স্টোরেই পাওয়া যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে সাইটগুলো বন্ধ না হওয়ায় জুয়া খেলায় তেমন প্রভাব পড়ছে না খেলোয়াড়দের। বছরে পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন জুয়া থেকে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। সে হিসেবে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে। যার বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে যাচ্ছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক চক্রের দুই এজেন্টসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। শুধুমাত্র এই চক্রটিই গত এক বছরে চক্রটি অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে পাওয়া ২০-৩০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তারা রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে এসব জুয়ার সাইট পরিচালিত করে আসছিল।দেশে বসেই ১৮০টি জুয়ার সাইট পরিচালনাকারী সম্প্রতি এক সহযোগীসহ সবুজ সরকার নামে এক জুয়ার সাইট পরিচালনাকারীকে গ্রেফতার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন বিদেশ থেকে অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব সাইটের বাংলাদেশি এজেন্টদের আনা হয়েছে আইনের আওতায়। তবে এবারের ঘটনা ভিন্ন। গ্রেফতার সবুজ দেশে বসেই ১৮০টি জুয়ার সাইট চালিয়ে আসছিল। এসএসসি পাস এই যুবক এ কাজ করে গত পাঁচ বছরে ৫ কোটি টাকা হাতিয়েছে। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের ইনচার্জ অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. আশরাফউল্লাহ জানান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় করা একটি মামলা তদন্তের একপর্যায়ে এই চক্রের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। এরপর গত ৫ জুলাই জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অভিযান চালিয়ে ১৮০টি জুয়ার সাইটের মালিক সবুজ সরকার ও তার এজেন্ট মেহেদী হাসান ওরফে রনিকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সবুজের মাধ্যমে জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার পশ্চিমপাড়া গ্রামের তরুণদের বড় অংশই এখন জুয়ার সাইট পরিচালনায় যুক্ত। এর আগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও মধুখালীতে যেভাবে অনলাইন ব্যাংক গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল, তেমনি পশ্চিমপাড়ায় বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন জুয়া। সোশ্যাল মিডিয়াও অনলাইন জুয়ার ফাঁদ তৈরি করেছে। ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে চোখ রাখলেই দেখা যায় শর্টকাট উপায়ে কোটিপতি হওয়ার নজরকাড়া বিজ্ঞাপন। হাত বাড়ালেই কোটি কোটি টাকা, লাক্সারিয়াস বাড়ি-গাড়ি, আইফোন, বিলাসীজীবন, কী নেই এখানে? তবে এসব কিছু পেতে হলে করতে হবে অনলাইন ট্রেডিং কিংবা খেলতে হবে জুয়া। ফেসবুকে গ্রিমলিউ, জুলি পিক, সোলার ভ্যালি, চিরিটা সিনেনসিস, জাস্ট উইনসহ শত শত পেজ থেকে অনলাইনে জুয়া খেলার জন্য বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এ ধরনের জুয়া কিংবা ট্রেডিংয়ে আকৃষ্ট করতে ব্যবহার করা হচ্ছে সিনেমার নামিদামি তারকা এবং দেশসেরা ক্রিকেটারদের ছবি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাইটগুলো বেশিরভাগই দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে পাশের দেশ ভারত থেকে ‘এক্সপার্ট অপশন’ ও ‘বিনোমো’ সাইট দু’টি পরিচালিত হয় আর ‘আইকিউ অপশন’ পরিচালিত হয় ইউএস থেকে। এর লেনদেন হয় সাইপ্রাস থেকে। ইদানিং একটি ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কীভাবে মাত্র ১ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা আয় করা যায়, বাংলাদেশিরা ঘরে বসে আয় করার জন্য একটি অ্যাপস ব্যবহার করছে। শতাধিক লোক ইতিমধ্যে সবাই মিলে ২ কোটি টাকার বেশি জিতেছে। তাদের মতে, শুধু অ্যাপস ইনস্টল করে যে কেউ জিততে পারে, নতুন অংশগ্রহণকারীরা ২৫ হাজার টাকার মতো বোনাস পেতে পারে খেলা শুরু করার জন্য।’ ‘জাস্ট উইনস’ নামে একটি পেজে দেখা যায়, মোবাইল হাতে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের ছবি সংবলিত একটি বিজ্ঞাপন। সেখানে ক্লিক করলেই একটি অ্যাপস ইনস্টল করার কথা বলছে। বিজ্ঞাপনটিতে লেখা রয়েছে, ‘বাংলাদেশে প্রথম আইনি ক্যাসিনো, এখানে ২০০ টাকা জমা করলেই ৩১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বোনাস পাওয়া যাবে। নতুন এ অফারটি বিশেষভাবে বাংলাদেশের জন্য একটি অ্যাপে ৫০০টিরও বেশি প্রিয় গেম প্রতিদিন ১০০ জনের বেশি বিজয়ী। জুয়ার টাকা জোগাতে বাড়ছে বহুমুখি অপরাধ। এসব জুয়ার ফাঁদ এমনভাবে সাজানো যে, জুয়াড়ি দু-একবার জিতবেন, কিন্তু এতে আসক্ত হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া মানে সর্বস্ব খোয়ানো। এভাবে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছেন, জুয়ার টাকা জোগাতে খুনোখুনিসহ নানা অপরাধের ঘটনাও ঘটছে। গত ১৩ মার্চ রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় ব্যক্তিগত গাড়িচালকের হাতে খুন হন সেভেন রিংস সিমেন্ট কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপক। অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে টাকা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে খুন করে গাড়িচালক। আবার অনলাইন জুয়ায় বাধা দেওয়ায় গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাতিয়া পূর্বপাড়া গ্রামে স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন জুয়া নিয়ে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটছে। এসব চক্রের সদস্যরা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দেশে অনলাইনে জুয়া খেলার প্রবণতা বাড়ছে জানিয়ে তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গত ২৪ জুলাই জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয় বলে সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। এতে বলা হয়, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে অনলাইনে জুয়া খেলা বন্ধ করতে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বৈঠকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ডিএমপির সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, আমাদের টিম সবসময় এটি মনিটরিং করছে। সাইটগুলো দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। ফলে এটি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেখা গেল, এটি বন্ধে আমরা একটা প্রযুক্তি নিয়ে আসছি। চক্রটি আবার নতুন কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইটগুলো সচল রাখছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো টাকাগুলো দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।এ বিষয়ে তথ্য প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর উদাসীনতার ফলে ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। এতে একদিকে অর্থপাচারের কারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম বিপথে যাচ্ছে। তাই নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হয়ে মনিটরিং করে এটি বন্ধ করা উচিত এবং উহা জাতীয় স্বার্থরক্ষার বিষয় মনে করি।
১১:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
অবনী অনিমেষ
অনলাইন জুয়ার আসক্তিতে আসক্ত বাংলাদেশ
Tag :
জনপ্রিয়