শেখ মিলন মোহাম্মদ
‘ওয়ান ইলেভেন’ শব্দটির সাথে পরিচিত নন এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল, কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি ওয়ান ইলেভেন সম্পর্কে জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে দুই চার বাক্য সঠিকভাবে বলতে পারবেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম , অর্থাৎ ওয়ান ইলেভেনের ইতিহাস এক পারসেন্ট লোকেও সঠিকভাবে জানে না, জনগণ শুধু এটাই বলতে পারে ওয়ান ইলেভেন এর প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবর্তিত হয়েছে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সরকার প্রধান হিসেবে ফখরুদ্দিন দায়িত্ব পালন করছেন, ব্যাস এপর্যন্তই। অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো জনগণের সামনে দৃশ্যমান নয়, জনগণ সেটা বুঝতেও পারেনি কি হয়েছে, কি হয়েছিল, বা কি হতে যাচ্ছে।
সেই প্রসঙ্গ আজকের আলোচনার বিষয় না হলেও শুধু এতোটুকু জানানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি যে, সেদিনও ৫ই আগস্ট ২৪ এর মত এমনই এক বিপ্লবের দিকে ধাবিত হতে যাচ্ছিল দেশ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন তারেক রহমান তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদকে সামরিক শাসন ঘোষণার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন, যদিও সেনাপ্রধানকে নির্দেশ দেওয়ার মতো কোন সাংবিধানিক ক্ষমতা তারেক রহমানের ছিল না, স্বভাবতই ষোলআনা মিলিটারি মেন্টালিটির একজন সেনা কর্মকর্তা এহেন ঔদ্ধতপূর্ণ আচরণ মেনে নিতে পারবেন না এটাই স্বাভাবিক, সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও জেনারেল মঈন উ আহমেদ বিএনপি সরকারের আমলে সেনাপ্রধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তথাপিও তিনি তারেক রহমানের এই প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দেন। এই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই তৎকালীন সময়ের জন্য সময়োপযোগী ছিল এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এ কথা অনস্বীকার্য যে একটি দেশে সামরিক আইন জারি হওয়া মানেই ঐ দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্হিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে অবনতির দিক নির্দেশ করে। কোন গনতান্ত্রিক দেশে সেনা শাসন কখনোইও কাম্য নয়। বহির্বিশ্ব তথা গণতন্ত্র মনা দেশ সমুহও কোনো গনতান্ত্রিক দেশে সামরিক শাসন দেখতে চায়না।
বলছিলাম তারেক রহমানের কথা। তারেক রহমানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্ষুব্দ হয়ে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ তাকে একপ্রকার অসম্মানজনকভাবে সেনাপ্রধানের অফিস থেকে বের করে দেন। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে জনাব তারেক রহমান সেনাপ্রধানকে তার পদ হতে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পক্ষান্তরে জেনারেল রেজাকুল হায়দারকে সেনাপ্রধান করার পরিকল্পনা করেন এবং জনাব তারেক রহমানের নির্দেশেই বঙ্গভবনে জেনারেল রেজাকুল হায়দারকে সেনাপ্রধান করার কাগজপত্র প্রস্তুত হতে থাকে। বিষয়টি বিশ্বস্ত সূত্রে জেনারেল মঈন উ আহমেদ এর কর্ণগোচর হওয়ায় তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভবনে গমন করত: সেটা প্রতিহত করেন এবং তত্ত্ববধায়ক সরকারের ফরমেটে জনাব ফখরুদ্দিন আহমেদ সাহেবকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নিতে বাধ্য হন। এই ছিল মোটামুটি সংক্ষিপ্ত আকারে ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট। অতপর সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় পরে নির্বাচন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। নির্বিঘ্নে চলছিল দেশ।
রাত-বিরাতে পথ চলতে সর্বসাধারণের কোন সমস্যা ছিল না, ছিল না দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, ঘুষ, ধর্ষণ, হয়রানি চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আর দাঙ্গা হাঙ্গামা কাহিনী নির্ভর কোন প্রতিবেদন। একথা তৎকালীন কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ মন্ত্রী, আমলা,সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী মহল, ব্যক্তি স্বার্থের তাগিদে অস্বীকার করলেও এদেশের আম জনতা অবশ্যই স্বীকার করবেন। এক কথায় উপযুক্ত আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মোটামুটি যথার্থ শান্তি শৃঙ্খলা বজায় ছিলো এই সময়টাতে ।
কিন্তু তর সইছিলো না তৎকালীন স্বার্থান্বেষী সদ্য ক্ষমতাচ্যুত দলীয় নেতা,আমলা তথা বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রভাবশালীদের। কারণ তাদের সব ধরনের অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর তাইতো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই বলে যে একটা কথা আছে তারই প্রতিফলন ঘটল। আবার সকল মাসতুতো ভাইয়েরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নেমে গেল, যত দ্রুত সম্ভব তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। এর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করল দুর্নীতিবাজ কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলশ্রুতিতে আন্দোলন আরো বেগবান হলো। প্রয়োজনীয় সময়ের অভাবে যথাযথ সংস্কার না করেই সরকারকে একটা যেন তেন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হলো। ফলে যা হবার তাই হল, সেই অগোছালো রাজনৈতিক পরিবেশ আর কর্দমাক্ত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই একটি দল ক্ষমতা লাভ করল, যদিও তার বিরোধীপক্ষ সেই নির্বাচনকে মেনে না নিয়ে আবারো আন্দোলন আর প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলো। বিশ্বের সামনে দৃশ্যমান হলো প্রতিহিংসা পরায়নতার আর এক বীভৎস রূপ। কে শোনে কার কথা, তত্ত্ববধায়ক সরকার প্রধান ও তার উপদেষ্টা মন্ডলীর অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল একছত্র আধিপত্য পেয়ে গেল আবার। চলল সেই হত্যা,গুম,খুন আর লুটতরাজ আর আত্মউন্নয়নের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
ফলাফল সরূপ জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে জন্ম নিল ৫ই আগষ্ট ২০২৪। সেইসঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে, দেশের জন্য কল্যাণকর প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের সংস্কারের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শান্তিতে নোবেল জয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে তৈরী হলো নতুন আর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। ইতিমধ্যেই এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের বিচক্ষণতা প্রমাণে সক্ষম হয়েছে, দেখিয়ে দিয়েছে অনেক বিগ বাজেট প্রকল্পের অর্থ ও সময়ের ইকোনোমি সমাধান।
কিন্তু সরকারের বয়স দুই মাস পার হতে না হতেই ক্রমান্বয়ে আবার ও দৃশ্যমান হচ্ছে সেই মাসতুতো ভাইদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, এ প্রসঙ্গে আমার ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে, জাতিসংঘের অধীনে কাজ করার সুবাদে আমার বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে, বিশেষ করে ওয়েস্ট আফ্রিকার আইভরি কোস্টে। আমি দেখতে পেয়েছি সেখানে জাতিগত, দাঙ্গা সরকারবিরোধী আন্দোলন, দল ও গোত্র ভিত্তিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা, সহিংসতা ও নৃশংসতা। কিন্তু একটি বিষয়ে তারা সকলেই খুব একাট্রা,আর তা হল ওই দেশের মদের ফ্যাক্টরি গুলো, তা সেটা যে দল, যে সমাজ, যে জাতি গোষ্ঠী বা সরকারেরই হোক না কেন কেউ সেখানে হস্তক্ষেপ করে না। কারণ দিনশেষে অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ওটা সবারই খুব প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়ে ওঠে।
সেই দিক বিবেচনায় ঘুষ দুর্নীতি অন্যায় অবিচার প্রতিহিংসা আমাদের সমাজের রন্ধে রন্ধে এমন ভাবে বাসা বেঁধেছে এবং আমাদের একশ্রেণীর জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী আমলা সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের এত বেশি প্রয়োজনীয় উপকরণ হয়ে উঠেছে যে এটাকে উপেক্ষা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এটা কে টিকিয়ে রাখা মানেই তাদের জীবন জীবিকায় স্বাচ্ছন্দ থাকা, তাই তো এ ব্যাপারে সবাই ঐক্যবদ্ধ।
এ কারণেই কেন জানি ভয় হয় সত্য সুন্দর আর আদর্শের বানী নিয়ে এই দেশে আদৌ কি কারও টিকে থাকা সম্ভব!
যে দেশে সমাজের রন্ধে রন্ধে ঢুকে আছে অশুভ শক্তির দৌরাত্ম্য, তাদের কাছে আছে নামে বেনামে কালো টাকার পাহাড়। বর্তমান সময়ে টাকা থাকলেই তো বিনিময়ে সিন্ডিকেট সহ সবকিছু করাই সম্ভব। দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা সম্ভব। সর্বোপরি এদেশের অধিকাংশ সাধারণ জনগণকে কিনে নেয়া সম্ভব। তাদেরকে দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল মিটিং করানো সম্ভব। তাদেরকে দিয়ে শ্লোগান দেওয়ানো সম্ভব। তাদেরকে দিয়ে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ানো সম্ভব। এ সব সম্ভবের দেশে অসম্ভব বলে মনে হয় কিছুই নেই। শুধু ন্যায়, সত্য আর আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করাই অসম্ভব।
আর তাইতো কেন জানি ভয় হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহীত ধনাত্মক কার্যক্রমে ঈর্ষান্বিত অপশক্তির ব্যক্তি স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হওয়ার কারণে তাদের অপতৎপরতায় আমাদেরকে আবারও পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে না তো?